ক্লাস শেষে হলে এসে খাবারদাবার খেয়ে একটি ভাত ঘুম সেরে নিলাম। উঠতে উঠতে বিকেল হয়ে এলো। ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই চমকে উঠলাম, আমার এক ব্যাচ মেট একটি ছবি দিয়েছে। মহাস্থানগড়ের সামনে লাল ইটের প্রকাণ্ড দেয়ালের সামনে হেলান দেওয়া- ক্যাপশনে লেখা, হঠাৎ ঝটিকা ভ্রমণ। আমার চোখ কপালে উঠলো। আরে ওকে তো আজই ক্লাসে দেখলাম, আমার পাশেই বসেছিল। তাহলে আজকেই কীভাবে মহাস্থানগড়ে গেলো?
পরেরদিন কলেজে যেতেই দেখি বান্দা হাজির। আমি ওকে ক্যাঁক করে ধরলাম। “এই কাহিনী কী রে? তুই না কালকে ক্লাস করলি, তাহলে আবার দিনের দিন খুলনা থেকে মহাস্থানগড়ে গেলি কীভাবে?” আমার কথা শুনে বন্ধু আমার বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো। তারপর হেসে লুটোপুটি খেল। হাসতে হাসতেই বলল, “তোরে কে বলল ওটা মহাস্থানগড়?”
আমাকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে বন্ধুবর হেসে বলল, “আরে ভরত ভায়নার নাম শুনিস নি? ওখানে গেছিলাম কালকে। ঘণ্টা পাঁচেকের মামলা”। আমি ভরত ভায়নার নাম জানতাম। একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। কিন্তু এত সুন্দর, তা জানতাম না। অমনি আমার ঘোরাঘুরির পোকা নড়ে বসলো। বন্ধু জ্যোতি প্রকাশ হালদার আর অনুপম সানাকে মেসেজ দিলাম, নেক্সট মিশন- প্রজেক্ট ভরত ভায়না। 

কিছুটা পথ ইটের, কিছুটা মাটির; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

পরের শুক্রবার রওনা দিলাম। ভ্রমণের ক্ষেত্রে সকাল সকাল রওনা দেওয়াই আমার পছন্দ। আমাদের যাত্রা শুরু হল সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড থেকে। সোজা কোনো পথ নেই ভরত ভায়না যাওয়ার। যেতে হবে ঘুরতি পথে। সোনাডাঙ্গা থেকে ইজি বাইকে দৌলতপুর হয়ে ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর বাজার। সকালে আমাদের কারো পেটে কিছু পড়েনি। তাই শাহপুর নেমেই খাঁটি দুধের সন্দেশ আর টকদই খেয়ে আবার যাত্রা আরম্ভ করলাম।
আমরা চলেছি ইঞ্জিন ভ্যানে। রাস্তার দু’পাশে সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে বসেছে ভাঁটফুলের জঙ্গল। কিছুক্ষণ পরে আমরা একটি নদীর উপরে এসে পৌঁছলাম। নাম হরি নদী। উপরে ব্রিজ আছে। ব্রিজের উপর থেকে আশেপাশের অনেকটা দেখা যায়। আমরা সেখানে নেমে খানিকটা গলা সেধে নিলাম। কিন্তু আমাদের ত্রিমূর্তির যে গানের গলা- মানুষজন বিরক্ত হওয়ার আগেই আবার ভ্যানে উঠে পড়লাম।
ভরত ভায়নার যাওয়ার পথ পুরোটা পাকা নয়। কিছুটা পথ কাচা রাস্তা এবং কিছু অংশে ইট বসানো। খানিক দূর থেকেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো ভরত ভায়না। সমস্ত এলাকাটি বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। গেট দিয়ে ঢুকতেই একটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দুজন লোকের দেখা পেলাম। প্রত্যেক দর্শনার্থী নাম-ধাম লিখছেন সেখানে এবং ফেরার সময় মন্তব্যও জানিয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে এটি ভরত রাজার দেউল বা ভত্তের দেউল নামে পরিচিত। বিভিন্ন অনুসন্ধানের ফলে এখান থেকে পাওয়া পোড়ামাটির ইট, মূর্তি, মাটির পাত্র, পুতি প্রভৃতি বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বৌদ্ধ সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। এই বৌদ্ধবিহারটি সম্ভবত সেই উৎকর্ষতার প্রতীক হিসেবেই গুপ্তযুগের দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল।

ভরত ভায়না; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

স্থানীয় লোকশ্রুতি মতে, তখন এই অঞ্চল ভরত নামের এক রাজা শাসন করতেন। তিনিই নির্মাণ করেই এই স্থাপনা। এই লোকশ্রুতির প্রমাণ হিসেবেই, এই প্রত্নস্থান থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণে গৌরিঘোনা গ্রামের একটি ছোট আকারের প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ আছে। স্থানীয়দের মতে এটিই ভরত রাজার বাড়ি।
চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং গৌতম বুদ্ধের স্মৃতিময় স্থান ও অন্যান্য নিদর্শন চাক্ষুষ করার জন্য এবং উপমহাদেশের বৌদ্ধ পণ্ডিতদের রচনা সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতবর্ষে এক দীর্ঘ সফর করেন। তিনি ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে এ যাত্রা আরম্ভ করেন। তিনি তার যাত্রায় ভারতবর্ষের উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধবিহারগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। তার স্মৃতিকথায় সমতট জনপদের ৩০টি বৌদ্ধবিহারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক কে এন বসু এই স্থানে জরিপ করেন। তিনি মতপ্রকাশ করেন যে, “ঢিবির নিচে পাঁচ শতকের প্রাচীন একটি বৌদ্ধ মন্দির আছে এবং এটি সম্ভবত হিউয়েন-সাং বর্ণিত সমতট এর ৩০টি সংঘারামের একটি। অতীতে ঢিবিটি কয়েকবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি জমির মালিকরা চাষের জমি সম্প্রসারণের জন্য ঢিবির ঢাল থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ কেটে সমতল করেছে।”

ক্রমাগত দখলদারিত্ব একে করেছে সংকুচিত; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

কে এন বসু যে ঢিবি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা তুলে ধরেছিলেন, তা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। ফলে এখন যেটুকু দেখা যায় তা থেকে এই বিহারের আদিরূপ কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব না। হয়তো এটি মহাস্থানগড়ের মতোই জমকালো স্থাপনা ছিল কিংবা কে জানে- হয়তো তার চেয়েও বৃহৎ ছিল এর পরিধি। এখন যেটুকু টিকে আছে তার ভিত্তি প্রায় ২৫০ মিটার পরিধি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাটি থেকে এটি ১২ মিটারের চেয়ে বেশি উঁচু। আগে আরো উঁচু ছিল কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এটি ধ্বসে যায়। মোচাকৃতির এই স্থাপনাটি দূর থেকে একটি ছোটখাটো পাহাড় মনে হয়।
স্থাপনার উপরে বেশ কয়েকজন লোক ঘুরে ঘুরে দেখছে। একজন লোক দেখলাম কয়েকজন কিশোরকে এর সম্পর্কে কিছু বলছে। আমি এগিয়ে যেতেই তিনি নিজের পরিচয় দিলেন। একটি স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক তিনি। সেই সাথে সাংস্কৃতিক কর্মী। কয়েক গ্রাম দূরেই বাড়ি। মানুষকে ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করার কাজ করে থাকেন তিনি। সেই উদ্দেশ্যেই এসেছেন এখানে।

ছবি দেখে ভ্রম হয়, এ যেন এক মহাস্থানগড়; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৫ সালে এখানে সর্বপ্রথম খননকাজ চালনা করে। দ্বিতীয়বার খনন চালানো হয় প্রায় দশ বছর পরে ১৯৯৫-৯৬ সালে। কোনো এক অজানা কারণে এখানে খুব বেশি প্রত্ন সামগ্রী পাওয়া যায়নি। যেগুলো পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে পোড়ামাটির ফলক ও আসবাবপত্র, মাটির তৈজসপাত্র, মূর্তি, লোহার তৈরি হাতিয়ার, গবাদি পশুর হাড় ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে- গুপ্তযুগের একটি পোড়ামাটির মাথা ও মানুষের হাত ও পায়ের কয়েকটি ভগ্ন টুকরা, মাটির প্রদীপ, অলংকৃত ইট, পদচিহ্ন সংবলিত দুটি ইট, একটি মাটির ক্ষুদ্র পাত্র প্রভৃতি।
আমাদের ঘোরাঘুরির পর্ব সম্পন্ন হলো। এবার স্মৃতি রক্ষণের পালা। ভাগ্যিস ট্রাইপড ছিল। টাইমার সেট করে একটি কক্ষের ভগ্নস্তূপের উপর বসলাম তিনজনে। তারপর অমিতাভ মুদ্রায় ধ্যানস্থ হলাম ছবি তোলার স্বার্থে। চোখ বন্ধ করতে এক অন্যরকম দৃশ্য মনের পর্দায় ভেসে উঠল। এই প্রাচীন স্থাপনায় হয়তো কয়েক সহস্রাব্দ আগে এমনই ভঙ্গিমায় পরম সত্যের সন্ধানে শতশত ভিক্ষু নিজেকে নিয়োজিত রাখতো দিনের পর দিন।

প্রাচীন এই বৌদ্ধ স্থাপনা আপনার মন অন্যরকম করে দিতে বাধ্য; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

কীভাবে যাবেন:

ভরত ভায়না যশোর জেলায় অবস্থিত হলেও যশোর শহর থেকে যাওয়ার চিন্তা বোকামি হবে। এটি আসলে খুলনার খুব কাছে। ঢাকা বা যে কোনো স্থান থেকে ট্রেন বা বাসে খুলনা চলে আসবেন। যাত্রা শুরু করবেন খুলনার দৌলতপুর থেকে। দৌলতপুর থেকে একটু সামনে মহসিন মোড় থেকে মহেন্দ্র গাড়িতে করে যাবেন শাহপুর বাজার।
এখান থেকে চাইলে খাওয়াদাওয়া করে নিতে পারবেন। বেশ ভালো মানের দই পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত আসতে পকেট থেকে খসবে জনপ্রতি ২০ টাকা। শাহপুর বাজার থেকে ভ্যান বা ইজি বাইক করে যেতে হবে ভরত ভায়না। তবে স্থানীয় মানুষেরা একে ভত্তের দেল নামেই বেশি চেনে। সাত-আট কিলোমিটার দূরত্ব ২০-২৫ টাকা করে নেবে। তবে ভ্যান রিজার্ভ করে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ আসার পথে গাড়ি পাওয়া খুব দুষ্কর।
আশেপাশে থাকার কোনো জায়গা নেই। আপনাকে থাকতে হবে খুলনা শহরে। রয়েল হোটেল, ক্যাসল সালাম, হোটেল মিলেনিয়াম, হোটেল টাইগার গার্ডেনসহ আরো ছোট-বড় অনেক হোটেল ছড়িয়ে আছে খুলনা শহর জুড়ে।
Feature Image: Amitav Aronno

Author

Write A Comment