বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি বলা হয়। এই দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অপার সৌন্দর্যের আধার। শুধু চোখ মেলে দেখতে হয় সৌন্দর্যের অপার এই লীলাভূমিকে।
নাপিত্তাছড়া ট্রেইল এমনই এক সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছে আপনার জন্য। হাতে একদিন সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন নাপিত্তাছড়া থেকে।

সবুজে ঘেরা বান্দরিখুম; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এই ট্রেইল মূলত ঝর্ণা ও ঝিরির। ট্রেইলে আছে সুন্দর ঝর্ণা, ক্যাসকেড আর খুম। একটু হাঁটা হাঁটির অভ্যাস থাকলে যে কেউ যেতে পারে একদিনের এই সুন্দর ট্রেইলে। তবে যাওয়ার আগে পর্যন্ত জানতাম যে নাপিত্তাছড়া নিজেই একটা ঝর্ণা।
হুট করেই প্লান হলো নাপিত্তাছড়ায় যাওয়ার। যেহেতু একদিনে ঘুরে আসা যায় তাই আর না করতে পারলাম না। আরামবাগ মোড় থেকে বাসে উঠলাম রাত ১১টায়।
সকাল সকাল নেমে পড়লাম ন’দুয়ারী বাজারে। সেখান রুটি, ডাল আর ডিম দিয়ে নাস্তা সেরে হাঁটা শুরু। গাইড হিসেবে ন’দুয়ারী বাজার থেকে লোকাল এক ছেলেকে নেওয়া হলো, নাম শাহিন।

ঝিরি; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

ন’দুয়ারী বাজার থেকে পূর্ব দিকে ৫/৭ মিনিট হাঁটলে রেল লাইন পড়বে। রেল লাইন পার হলেই গ্রাম। এই গ্রামের নাম নাপিত্তাছড়া।
গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে যেতে থাকি। রাস্তার দুই পাশের জমিতে বিভিন্ন সবজি দেখা যায়। টাটকা সবজি দেখে এক মুহূর্তের জন্য হলেও  মনে হবে যে ফেরার সময় কিছু সবজি ঢাকায় নিয়ে যাই।

ঝিরি ধরে এগিয়ে চলা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

মেঠোপথ শেষ হলেই ঝিরি আর পাহাড়ি পথ ধরে ট্রেকিং শুরু। ঝিরি ধরে পিঁপড়ার সারির মতো সামনে এগোতে থাকি। বেশ কিছু বড় বড় বোল্ডার পাড়ি দিতে হয়।
একটানা দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটা আর পাহাড়ি পথ চড়াই-উৎরাইয়ের পর শ্রান্ত- ক্লান্ত শরীর নিয়ে কিছুটা সময় জিরিয়ে নেই। আর দূর থেকে ভেসে আসছে ঝর্ণার পানি পতনের শব্দ।
সামনে এগোলেই দেখা মেলে বিশাল এক ক্যাসকেডের। নাম তার টিপরাখুম।

টিপরাখুম ক্যাসকেড; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এই ক্যাসকেডটি দেখে চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। কী বিশাল ক্যাসকেড! পাথরের গা বেয়ে পানি পড়ে সামনেই তৈরি হয়েছে জলাশয়। অনেকটা বাথটাবের মতো হলেও এটা আসলে প্রাকৃতিক বাথটাব। এখানে গা ভেজাতেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।
টিপরাখুমের বামপাশ দিয়ে উপরে উঠে একটু সামনেই  অপেক্ষা করছে কুপিকাটাখুম।

কুপিকাটাখুম; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

দু’পাশে সবুজ বন তার মাঝে আঁকাবাঁকা সুরু পানির ঝর্না। তবে কুপিকাটাখুম নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। কুপিকাটাকে অনেকেই ঝর্ণা বলে থাকে।
কুপিকাটাখুমের ডান পাশ দিয়ে উঠে পাহাড় ধরে এগোলেই সামনে আবার ঝিরি পড়বে। ঝিরি ধরে সামনে এগিয়ে গেলে হাতের বামে গেলেই দেখা মিলবে আরেকটি ঝিরির। এই ঝিরি ধরে ৩০ মিনিট হাঁটলে দেখা মিলবে বাগবিয়ানি ঝর্ণার।

বাগবিয়ানি ঝর্ণা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

দুই পাশে আকাশ সমান পাহাড়। সবুজ শ্যাওলা ধরা পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ সাদা জলধারা। কী অপরূপ সৃষ্টি! ঝর্ণার সামনে ছোট করে জলাশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

বাগবিয়ানি ঝর্ণা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

বাগবিয়ানি ঝর্ণা দেখা শেষ হলে আবার মূল ঝিরিতে ফিরে আসি। এই ঝিরি ধরে সামনের দিকে গেলেই আবার দেখা মেলে বান্দরখুম বা বান্দরিখুম ঝর্ণার। নাপিত্তাছড়া ট্রেইলের প্রধান ঝর্ণা। এটাকে অনেকে নাপিত্তাছড়া ঝর্ণাও বলে।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ স্থির হয়ে রইল। অসম্ভব সুন্দর একটি ঝর্ণা। পাহাড় বেয়ে আছড়ে পড়ছে পানি! সবুজ লতাপাতা পরম মমতায় পাহাড় আর ঝর্ণাকে আগলে রেখেছে।

বান্দরিখুম বা নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এই পৃথিবীর যে সকল জায়গায় সভ্য মানুষের চলাচল কম, সেই সকল জায়গা কত যে অদ্ভুত সুন্দর তা এইবার যেন ভাল করে উপলব্ধি করতে পারলাম। আর সেই মুহূর্ত থেকে বুনো জঙ্গলের মোহ আমাকে পেয়ে বসল। এই নির্জনতার কী আকর্ষণ আছে বলতে পারছি না- তবে আজকাল তা আমাকে ক্রমশ টানতে থাকে। এই সবুজ পাহাড়, জঙ্গল, মাটির তাজা সুগন্ধ, এই স্বাধীনতা, এই মুক্তি ছেড়ে ঢাকার যান্ত্রিক জীবনে আর ফিরতে ইচ্ছে করছে না।

পাহাড়ি ঘর; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এই মনের ভাব আমার একদিনে তৈরি হয়নি। কত রূপে কত সাজে বন্য প্রকৃতি যে আমাকে মুগ্ধ করেছে তা লিখে বোঝানো সম্ভব না।
ঝর্ণা দেখার উপযুক্ত সময় জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর। এই সময় ঝর্ণাগুলো ফুলেফেপে থাকে। বর্ষায় ঝর্ণাগুলো পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়।
এখানে ঘণ্টাখানেক থেকে এবার ফিরতি পথে যাত্রার পালা। আবার দু’ধারে ছায়ানিবিড় বনপথ ধরে ঘরে ফিরি।

ক্যাসকেড; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে উঠবেন। শ্যামলী, সাউদিয়া, হানিফ, ঈগল সহ অনেক পরিবহন যায়। ভাড়া নন-এসি ৪৮০ টাকা আর এসি ১,১০০ থেকে ১,২০০টাকা। এছাড়া ট্রেনে করে চট্টগ্রাম থেকে আসতে পারেন। যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম মিরসরাই পার হয়ে বড়তাকিয়া বাজার থেকে দুই কিলোমিটার সামনে ন’দুয়ারী বাজারে নামবেন। এখান থেকে লোকাল যে কাউকে নিয়ে চলে যাবেন নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে।

গাইড খরচ:

লোকালদের সাথে কথা বলে জানা যাবে। তবে ৪০০-৬০০ টাকার মধ্যে।

থাকা- খাওয়া:

শুধু এই ট্রেইলে গেলে থাকার দরকার হয় না। যদি এই ট্রেইলের সাথে অন্য কোনো জায়গা যোগ করেন তাহলে থাকতে হতে পারে। ন’দুয়ারী বাজারে থাকা-খাওয়ার তেমন ব্যবস্থা নেই। হয় আপনাকে সীতাকুণ্ডে যেতে হবে না হয় বারৈয়াহাটে থাকতে হবে। শুকনা খাবারই একমাত্র ভরসা।

অবশ্যই মনে রাখবেন:

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়েই ফিরুন।
ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম 

Author

Write A Comment