রুপসী বাংলার মাঠ, ঘাট, দ্বীপ ও চরের চারপাশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। সবুজের সমারোহের বিশাল ঐশ্বর্যের দিকে যে নাবিক পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে তাকায় সে নাবিক কখনো অসুখী থাকতে পারে না, হতাশ হতে পারে না, ক্লান্ত হতে পারে না। বাংলার আনাচেকানাচে শিশিরের ফোঁটায়ও যেন কবিতারা এসে জমা হয়, সৌন্দর্য এসে জমা হয়।

পলিমাটি, নদী, চরের মাদকতায় চোখ ডুবাতে বাধ্য এদেশের সাধারণ মানুষ। অথচ অজানার কারণে মোহনীয় অনেক স্থান ভ্রমণপিপাসুদের চোখের আড়ালে পড়ে যায়। তাই আজ আলোচনা করবো বাংলাদেশের দর্শনীয় কয়েকটি চর নিয়ে যেখানে ভ্রমণ করে আপনি পেতে পারেন আত্মার খোরাক। আসুন জেনে নিই অসাধারণ কয়েকটি চর সম্পর্কে যেখানে বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের নিয়ে স্বল্প খরচে ঘুরে আসতে পারেন আপনিও।

চর কুকরি মুকরি

ছবিসূত্রঃ adventureonbd.com
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় চর কুকরি মুকরি অবস্থিত। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি এই চরটি  মেঘনা ও তেতুলিয়ার মোহনায় অবস্থিত। এই চরের নামকরণের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে জানা যায় ১৯১২ সালে জার্মান যুবরাজ প্রিন্স ব্রাউন শিকারের উদ্দেশ্যে এই চরে আসেন। তারপর দেখতে পান একটি কুকুর ও বিড়াল ছুটোছুটি করছে। সেই থেকে অজানা চরের নাম রাখা হয় কুকরি মুকরি।

ছবিসূত্রঃ archive.banglatribune.com

এই চরের সবুজের হাতছানি দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হবে। মেঘনার স্বচ্ছ পানি, শান্ত নীরব প্রকৃতি, রাতে পেঁচার ডাক, সন্ধ্যায় জোনাকিদের ওড়াউড়ি, ভোরের সূর্যের লুকোচুরি খেলা, রাতের জ্যোৎস্না দেখার মাদকতায় মুগ্ধ হবে দর্শনার্থী। এখানে বিকেলের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে আর পুরো চর যেন এক মোহনীয় মাদকতায় ছেয়ে যায়। এছাড়া এই চরে পশু, পাখি ও সরীসৃপ প্রাণী রয়েছে।

ছবিসূত্রঃ archive.banglatribune.com

শেয়ালের দল, হরিণের পাল, মহিষের সারি বেঁধে চলার সৌন্দর্য দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই যেতে হবে কুকরি মুকরি ভ্রমণে। এখানে অসংখ্য নাম না জানা গাছের সারি রয়েছে এবং বালুকাময় বিস্তৃর্ণ সমতল ভূমি দেখলে কিছুক্ষণের জন্য আপনার মনে হবে সমুদ্র সৈকতে পা রেখেছেন। শীতকালে অসংখ্য অতিথি পাখিরা জমায়েত হয় এখানে।

এই চরের বনে বিভিন্ন প্রাণী দেখা যায় যেমন উদবিড়াল, হরিণ, বানর, সাপ, গুই সাপ, বেজি, কচ্ছপ ইত্যাদি। এছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি রয়েছে যেমন, বক, বনমোরগ, ময়ূর, শঙ্খচিল, মাথুরা ইত্যাদি। চরে ভ্রমণের জন্য শীতকাল উপযুক্ত সময়। তবে যেকোনো মৌসুমে এখানে ভ্রমণ করতে পারবেন। এখানে উপভোগ করতে পারবেন বিশাল বালুকারাশি, স্পষ্ট জলরাশি, সর্পিল লেক, বালুকাময় তীর, সৈকত, সুশীতল ও নির্মল হাওয়া।

যাওয়ার ব্যবস্থা

দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে জলপথে ভোলা যেতে হবে। ভোলার লঞ্চঘাট থেকে চরফ্যাশনের বাসে চড়ে যেতে হবে চর আইচাতে। চরফ্যাশন থেকে অটোরিকশা করে যেতে হবে কচ্ছপিয়া ঘাট। কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে ইঞ্জিনের নৌকায় চড়ে পৌঁছাতে হবে কুকরি মুকরি চরে।

থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা

চর কুকরি মুকরিতে বিশেষভাবে খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে স্থানীয় হোটেলগুলোতে খেতে পারবেন। এছাড়া চাইলে নদী থেকে মাছ ধরে কিংবা বাজার থেকে মাছ কিনে স্থানীয় কাউকে রান্না করতে বলতে পারেন। খাওয়ার পানি সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো। আর স্থানীয় দোকানের মিষ্টি অবশ্যই খাবেন।
থাকার জন্য এনজিও অফিস, সাইক্লোন সেন্টার, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ব্যবহার করতে পারেন নতুবা স্থানীয় কারো বাসায় থাকতে পারেন। দল বড় হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বাসায় থাকা কষ্টকর হবে।

ঢাল চর

ছবিসূত্রঃ Poriborton
ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার ইউনিয়ন হলেও ঢালচর নদীর স্রোতে ভেঙে ভেঙে প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পূর্বে এটি মনপুরা ইউনিয়নের অধীনে ছিল। মেঘনার রূপ ভয়ঙ্কর হলেই ঢাল চর ভেঙে যায়। একটু দমকা বাতাসেই উত্তাল হয়ে ওঠে মেঘনা নদী। ঢাল চর, চর আলম আগে অবিচ্ছিন্ন থাকলেও এখন মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে এক কিলোমিটার প্রশস্ত মেঘনা নদী।

ছবিসূত্রঃ Poriborton

ঢাল চরের ঘন বন, সমতল ভূমি, নির্জন পরিবেশ আপনাকে শান্তির পরশ দিতে পারবে। বন্ধুবান্ধব মিলে একসাথে ঢাল চরে গেলে ক্যাম্পিং করে থাকতে পারবেন। তাছাড়া খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা, রান্না-বান্না নিজেরা করতে পারেন।

ছবিসূত্রঃ Poriborton.com

এখানে বনভোজনের ভালো পরিবেশ পাবেন। ঢালচরের নীরব পরিবেশে বন্ধুরা মিলে আড্ডা, গানের আসর বসাতে পারবেন। নদীতে নৌকায় করে ঘোরার সময় সাবধানে থাকবেন। নদীতে উত্তাল বাতাস থাকলে নৌকা নিয়ে বের না হওয়াই উত্তম। সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখবেন।

যাওয়ার ব্যবস্থা

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ভোলা জেলায় যাবেন। ভোলা থেকে কচ্ছপিয়া ঘাট, সেখান থেকে ট্রলার বা লঞ্চে করে ঢাল চরে যাবেন। সময় লাগবে প্রায় ২ ঘন্টা। ট্রলার ভাড়া নিলে মাছ ধরার ট্রলার ভাড়া নেয়া উত্তম।

পদ্মার চর

ছবিসূত্রঃ bdnews24
পদ্মার চর চাঁদপুরে অবস্থিত। এই চরটিকে কেউ কেউ মিনি কক্সবাজার হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকেন। বছরের ছয় মাস এখানে চর জেগে থাকে। চাঁদপুর বড়স্টেশন মোলহেড থেকে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নদী পথে এই চরে যাওয়া যায়।

ছবিসূত্রঃ সচলায়তন

শীত মৌসুমে পদ্মার চরের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় স্থানীয়রা। আশেপাশের অনেক মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। অনেকে বলে থাকেন মিনি কক্সবাজার খ্যাত এই চরে আসলে এক প্রকার শান্তির নিঃশ্বাস নেয়া যায়। বিশাল জলরাশির ছোট ছোট ঢেউ, পাল তোলা নৌকা, ইঞ্জিনের নৌকা, সুশীতল বাতাস যেকোনো মানুষের মন কেড়ে নেয়।

যাওয়ার ব্যবস্থা

ঢাকা থেকে নদী পথে চাঁদপুর যেতে হবে। সেখান থেকে বড় স্টেশন মোলহেডে যেতে হবে। বড় স্টেশন থেকে ট্রলার ভাড়া করে কিংবা রিজার্ভ করে যেতে হবে পদ্মার চরে।

Author

Write A Comment