বাতাসে উড়ছে চুল, পায়ের নিচে চকচকে পাথর আর চোখে আটকে আছে শান্তভাবে বয়ে চলা জলধারার দিকে। প্রকৃতির এমন রূপ উপেক্ষা করা ক’জনের পক্ষেই বা সম্ভব! হ্রদের চারপাশের প্রকৃতি যেন প্রশান্তির ছোঁয়া বয়ে আনে, স্বচ্ছ পানির স্রোত মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় উদাসীনতার ভেলায়। তাই এমন উদাস করে দেওয়া অভিজ্ঞতার ঝাঁপি আর একটু বোঝাই করতে সাহায্য করতেই আজ বর্ণনা দেয়া হয়েছে বিশ্বের কিছু অপরূপ হ্রদের।

১. লেক ব্লেড (Lake Bled, Slovenia)

স্লোভেনিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এই হ্রদের অতুলনীয় সৌন্দর্য দেখে মোহিত হবে যে কেউ! এ যেন হুবহু ছবির পট থেকে উঠে আসা ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ এর সেট। এ হ্রদটি স্লোভেনিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক হ্রদ। এই রূপকথার ন্যায় ব্লেড হ্রদটি রোইং-চ্যাম্পিয়নশিপের মূল উদ্যোক্তা, জুলিয়ান আল্পসের নিবাস ভূমি। আবার ১৭০০ শতকে নির্মিত এক প্রাচীন প্রার্থনা ঘর, ‘চার্চ অব অ্যাসাম্পশন’ যেন বাড়িয়েছে এ হ্রদের আকর্ষণ। এখন এই হ্রদকে দেখে কোনো চলচ্চিত্রের সেটের চেয়ে কম কিছু মনে হয় না।

অনন্য সৌন্দর্যের আধার লেক ব্লেড; Source: Unusual Places

২. লেক জেনেভা (Lake Geneva, Switzerland/France)

এই হ্রদটি নিয়ে সুইসরা গর্ব করতেই পারে, কেননা এর ৬০ শতাংশ অবস্থিত সুইজারল্যান্ড। অন্যদিকে ফ্রেঞ্চরা যদিও হ্রদটির ৪০ শতাংশের মালিক, তারা এই হ্রদের পানি বোতলজাত করে বিশ্বখ্যাত এভিয়ান ব্র্যান্ডের পানি বাণিজ্যকরণে সফল হয়েছে। সেই বিবেচনায় এই হ্রদের পানি বিশ্বের সবচেয়ে দামি পানির মধ্যে অন্যতম। তবে যা-ই হোক না কেন, দুই দেশই এ হ্রদের বরফে ঘেরা অর্ধচন্দ্রাকার আকৃতি এবং আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গগুলোর সৌন্দর্য নিয়ে একমত হবে।

হ্রদের চারপাশ জুড়ে শুধু নীলের ছড়াছড়ি; Source: Buzzkeys

৩. লেক নাকারু (Lake Nakaru, Kenya)

নাকারুর মাসাই ভাষায় আক্ষরিক অর্থ ‘ধুলা যুক্ত স্থান’।  যারা এই হ্রদ সম্পর্কে তেমন একটা জানে না, নাম শুনে ভেবে বসতে পারে এই হ্রদের চারপাশে শুধু খয়েরী আর বাদামী রঙ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু এখানে এসে তাদের অবাক হতেই হবে। চারপাশ জুড়ে যেদিকে চোখ যায় শুধুই সবুজ শৈবালের ঘনঘটা, মাইলের পর মাইল স্বচ্ছ কাছের মত নীলাভ হ্রদের পানি এবং ন্যাশনাল পার্কে বেশ বড় সংখ্যক বিলুপ্তপ্রায় কালো গণ্ডারের সমাহার। হ্রদের চারপাশে সবুজের পাশাপাশি গোলাপি রঙটার প্রাচুর্যও চোখে পড়বার মতো। যখন নাকারুর কূল ঘেঁষে ঝাঁকে ঝাঁকে ফ্লেমিঙ্গো পাখির ঢল নামে, পুরো এলাকা যেন মুহূর্তেই রঙের জোয়ারে ভেসে যায়।

বন্য প্রাণির অভয়অরণ্য এই হ্রদ; Source: Travel Jumia

৪. প্লিতভিস লেক (Plitvice Lakes, Croatia)

প্লিতভিস লেক, নদী আর হ্রদের সিঁড়ি যেন চলে গিয়েছে কোনো এক রূপনগরের দিকে। প্রায় ১৬টি নদীর জলপ্রপাত এক মোহনীয় আবেশে নিমজ্জিত করে রেখেছে পুরো এলাকাটিকে। সবচেয়ে উজ্জ্বল নভোনীল এবং সপ্রতিভ কিছু সবুজ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আকাশ এবং চারপাশে আর পায়ের নীচে বয়ে চলেছে কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীলাভ পানি। অপার্থিব এই হ্রদের সৌন্দর্যের কাছে হার মানতে বাধ্য বাকি সবকিছু। আর যদি সময় করে বিচরণ করা যায় পর্বত আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে লুকিয়ে থাকা গুহাগুলোতে, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই!

প্লিতভিস লেকের অপার্থিব সৌন্দর্য; Source: Triphobo

৫. লেক তিতিকাকা (Lake Titicaca, Bolivia/Peru)

নিঃসন্দেহে শুধু পানির পরিমাণের বিবেচনায়, এই হ্রদটি দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় হ্রদ। ধারণা করা হয় প্রাচীন ইনকা সভ্যতার সময়কালে হ্রদটির জন্ম। বিখ্যাত তিতিকাকা পানি ব্যাংয়ের দেখা এই হ্রদ বাদে আজকের দিনে আর কোথাও মেলে না। আন্দিজের পটভূমিতে এই নয়নাভিরাম হ্রদ একবার হলেও দেখে আসা ভ্রমণপিপাসু সকলের কর্তব্য।

দক্ষিণ অ্যামেরিকার দীর্ঘতম হ্রদ সৌন্দর্যেও পিছিয়ে নেই; Source: Mysteries and Conspiracies

৬. লেক ম্যাথিসন (Lake Matheson, New Zealand)

মাউন্ট কুক এবং মাউন্ট তাসমান, বরফ দিয়ে ঢাকা চূড়া নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত, নীল ম্যাথিসন হ্রদটি ঘিরে। ঈষৎ বাদামী পানিতে প্রতিফলন হয় পাহাড়-পর্বত থেকে চারপাশের সবকিছুর। আর সেই প্রতিফলনে প্রকৃতি নিজের রূপ দেখে বোধহয় সহসাই পরিতুষ্ট হয়

পাহাড় আর পর্বতে ঘেরা ম্যথিসন লেক; Source: Mysteries and Conspiracies

৭. ক্রেটার লেক (Crater Lake, Oregon)

এটি মূলত এককালে একটি ১২ হাজার ফুট উঁচু আগ্নেয়গিরি ছিল। পরে এর উপরের ভাগ জ্বলে উঠলে কালের বিবর্তনে সেটি হ্রদে পরিণত হয়। ক্রেটার লেক ন্যাশনাল পার্কের প্রধান আকর্ষণ এই ক্রেটার লেক। অসাধারণ নীলকণ্ঠ বর্ণের পানিতে পরিপূর্ণ, উঁচু পর্বত দিয়ে ঘেরা সবুজ চারপাশ এবং এক কৌতূহল উদ্দীপক গাছ যাকে ডাকা হয় ‘হ্রদের বৃদ্ধ’ বলে এর নিবাস ভূমি। এই হ্রদটির সাথে স্থানীয় কিংবা পর্যটকদের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বেশি একটা বেগ পেতে হয় না।

বরফে ঢাকা ক্রেটার লেক; Source: Wall Devil

৮. লেক গার্দা (Lake Garda, Italy)

ইতালির সবচেয়ে সুন্দর এবং দীর্ঘ লেকটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় প্রশান্তিতে কাটানোর লোভ উপেক্ষা করার সাধ্য কার-ই বা তেমন একটা হয়! উত্তরের দিকে চিরসবুজ স্থাপত্যের নিদর্শন আর তার পিছেই ‘মন্তে বালদো’। চমৎকার এই চিত্র সহজেই পুলকিত করে ফেলে পর্যটকদের। তার উপরে ইতালিয়ান আল্পস হয়ে বয়ে আসা বাতাসের মাদকতাও বেশ সহজেই ছাপ ফেলে মনে, আত্মায়। এই হ্রদের উত্তর দিককার এলাকা বেশ জনপ্রিয় পাল তোলা নৌকাবাইচের জন্য।

Source: Nat-Geo
লেক গার্দা; Source: traveldepartment.ie

৯. ফাইভ ফ্লাওয়ার লেক (Five Flower Lake, China)

জিউহাইগন ন্যাশনাল পার্কে অবস্থিত এই হ্রদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সৌন্দর্য হতবাক করে দেয় পর্যটকদের। যেন কোনো দক্ষ শিল্পী বালতি ভর্তি করে ছিটিয়ে দিয়েছে নীল, সবুজ আর হলুদ। সপ্রতিভ রঙগুলোর প্রাচুর্য মন ভালো করে দেয় নিমেষেই। একই সাথে প্রকৃতির এই রঙ-রূপকে উপেক্ষা করা কঠিনই হয়ে পড়ে কিছুটা। আর এই হ্রদের পানি এতটাই স্বচ্ছ যে নিচে পড়ে থাকা গাছের শেকড়গুলো পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।

নানা রঙের উপস্থিতি পুরোটা হ্রদ জুড়ে; Source: Yandex

১০. পেয়টো লেক (Peyto Lake, Canada)

এই হ্রদটির নামকরণ করা হয়েছিল একজন ভ্রমণ-গাইড, বিল পেয়টোর নামানুসারে। এই লেকের ভুবন বিখ্যাত ফিরোজা বর্ণ দেখতে বছরে হাজার হাজার দর্শনার্থীদের মেলা বসে এই হ্রদের ধারে, অ্যালবার্টার বাঁফ ন্যাশনাল পার্কে। পেয়টো তুষার নদ থেকে প্রতিফলিত হয়ে এই অসাধারণ রঙ ধারণ করে হ্রদটি। আর পানি যে নদী থেকে বয়ে আসে হ্রদটিতে, সাথে বয়ে আনে ‘রক ফ্লাওয়ার’। এই রক ফ্লাওয়ার আর ফিরোজা বর্ণ মিলে এমন এক দ্যুতিময় চেহারা দেয় হ্রদটিকে যা আধুনিক ফটোশপকেও সহজেই হার মানায়।

ফিরোজা বর্ণের হ্রদের পানি; Source©Matteo Colombo

ফিচার ইমেজ-Emanuel Smedbol

Author

Write A Comment