গঙ্গার উপরে কাঠের সেতু পেরিয়ে চিরবাসা পৌঁছাতে বেশ কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। কারণ নদীর তীর থেকে চিরবাসার ছোট্ট দোকান ঘরে পৌঁছাতে পেরোতে হয়েছে পাথরের পাহাড়। যেহেতু এর আগে কোনোদিনই এভাবে ছোট, বড়, মাঝারি আর বিশাল বিশাল পাথর পেরোতে হয়নি কোথাও, তাই পাথরের বাধা পেরোতে বেশ কষ্টই হয়েছে। একটা মাঝারি নড়বড়ে পাথরের উপর থেকে একটা বড় পাথরে ওঠাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

কোনো কারণে পা হড়কে পাথরের মাঝে আটকে গেলেই মহা সর্বনাশের সম্ভাবনা। যে কারণে পাহাড়ি ঢালে, পাহাড়ি বাঁকে, পাহাড় কেটে পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বানানো রাস্তায়, পাহাড়ের উপর থেকে ঝুলে থাকা পথে চলতে যতটা না সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়েছে, পাহাড়ের সমতলে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া হাজারো ছোট-বড় পাথরের পথ পেরোতে তার চেয়ে অনেক বেশি সাবধান থাকতে হয়েছে।

পাথুরের পথের শুরু। ছবিঃ লেখক

এই সাবধানতা পেরিয়ে চিরবাসার ছোট্ট ঘরের কাছে গিয়ে দেখি সেখানে বসার কোনো জায়গাই নেই। তাতে অবশ্য খুব একটা সমস্যা হয়নি। এত এত ঠাণ্ডা ছিল যে পাথরের উপরে রোদের মাঝে বসে থাকতেই বেশ আরাম লাগছিল। আর চিরবাসার এক চিলতে দোকান কাম থাকার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল একঝাক বিদেশী ট্রেকার, যারা আমার প্রিয় দেশ আর্জেন্টিনা থেকে গোমুখ ট্রেকে এসেছে।

ওদের নিয়ে পরে আলাদা গল্প লিখবো। যাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ ট্রেকেই আমার বেশ বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। আর তার চোখ, চাহুনি, অভিব্যক্তি, আড় চোখের চাহুনি, বাঁকা ঠোঁটের হাসি, কাজল টানা চোখ মাঝে মাঝেই একটু অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করছিল! সে গল্প এখানে থাক।

সকালে গাঙ্গোত্রীতে নাস্তা করেছিলাম আলু পরাটা আর চা দিয়ে। আলু পরাটা এত বড় ছিল যে সেটার অর্ধেকটা খেয়ে বাকি অর্ধেকটা ফয়েল পেপারে মুড়ে নিয়ে ব্যাগের পকেটে রেখে দিয়েছিলাম দুপুরের জন্য। চিরবাসার রোদেলা পাথরে বসে সেই আলু পরাটার অর্ধেক, খেজুর, বিস্কিট, আপেল আর চা দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে নিলাম।

তারপর অনেকটা সময় বিশ্রামের জন্য নিলাম অন্যদের দেখাদেখি আর আমার দুই সহযাত্রী যারা কলকাতা থেকে এসেছে তাদের চিরবাসা এসে পৌঁছানো পর্যন্ত। প্রায় এক ঘণ্টা চিরবাসায় বসে ছিলাম। এখানে পাথরের মাঝে হলেও, কোথাও কোথাও হালকা সবুজের ছোঁয়া ছিল। মাঝে মাঝে ছিল সবুজ গাছের ছায়া। যেখানে বিদেশী ট্রেকারদের কেউ কেউ ইয়োগা করে নিয়েছে কয়েক মিনিটের জন্য, একান্তে, নীরবে আর নির্জনে। ব্যাপারটা দারুণ লেগেছে।

চিরবাসার পথে ঘোরার সওয়ারি। ছবিঃ লেখক

চিরবাসার চারদিকেই পাহাড়ে ঘেরা। কোথাও কিছুটা সবুজ পাহাড়, কোথাও একদম পাথুরে পাহাড় আর কোথাও মাটির পাহাড়ের রুক্ষতা। সেই পাহাড়ের মাঝ দিয়েই বয়ে গেছে খরস্রোতা, উত্তাল, উচ্ছ্বসিত আর সদা যৌবনা প্রমত্তা পদ্মা, গঙ্গা বা ভাগিরথী নদী।

কিছুটা দূরে, নাম না জানা কিছু পাহাড় পর্বত আর জনমানবহীন কিছু দুর্গম পথ অতিক্রম করে গেলেই দেখা পাওয়া যাবে যার উৎপত্তি স্থলের। এখানে পাহাড়ের ঢালে, আর পাহাড়ের মাঝে বলেই কিনা কে জানে, শীতের প্রকোপটা খুব বেশী ছিল। অবশ্য সেটা না, এখানে বসে থাকার কারণে দারুণ রোদেলা আবহাওয়াও অনেক অনেক বেশী ঠাণ্ডা লাগছিল।

ওই দেখা যায় চিরবাসা। ছবিঃ লেখক

কিছুক্ষণ বসে, কিছুটা হেঁটে, মাঝে একটা প্রশস্ত পাথরে শুয়ে থেকে থেকে অপেক্ষা করছিলাম বয়স্ক দুই সহযাত্রীর। একটা সময় সেই পথে একজনকে আসতে দেখে তাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম অনারা আসছেন বেশ ধীর লয়ে। যাক তবুও তো আসছেন, সেই বেশ। যে পথ পেরোতে হয়েছে, হচ্ছে, তাতে ওনাদের মতো বয়স্ক মানুষ যে এই পথে আসতে পারছেন সেই অনেক।

এরই মাঝে দেখা হলো, কথা হলো আরও বেশ কিছু ট্রেকারের সাথে। কেউ দিল্লী, কেউ মুম্বাই, কেউ দেশের বাইরে থেকে এসেছেন। কেউ গোমুখ, কেউ তপোবন, কেউ আরও দূরে কোথাও অল্প বা বেশী দিনের জন্য ট্রেক করতে এসেছেন। যাদের অনেকের সাথে পর্যাপ্ত তাঁবু, খাদ্যের রসদ, পোর্টার, গাইড আর ঘোড়ার সওয়ারি রয়েছে। দারুণ, দারুণ সব মানুষ আর তাদের দারুণ দারুণ সব অভিজ্ঞতা আর আকাঙ্ক্ষা।

চিরবাসায় বিশ্রামে আর্জেন্টাইন টিম। ছবিঃ লেখক

বেশ অনেকটা সময় এখানে কাটালেও সময়টুকু দারুণ উপভোগ্য, অনেক অনেক অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ, দেশ-বিদেশের ট্রেকারদের নানা রকম গল্প শোনার সে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা বৈকি।

একটা সময় সকল ট্রেকাররাই তাদের নিজ নিজ পথে চলতে শুরু করাতে একদম একা হয়ে গেলাম। তাই সেই এক ঘেয়েমি কাটাতে আরও এক কাপ চা হাতে নিয়ে পাথরের উপরে বসে সামনের দিকে ঢালু পাহাড়ি ট্রেইলের দিকে তাকিয়ে রইলাম নদীর ওপারে। যদি আমার সেই দুই সহযাত্রীর দেখা পাই। আরও প্রায় ২০ মিনিট পরে দুজন মানুষের পিঁপড়ার মতো নড়াচড়া দেখতে পেলাম রুক্ষ পাহাড়ি পথের মাঝে।

ওনারা চিরবাসা এসে পৌঁছে যাওয়ার পরে, তাদেরকে আবারো বিশ্রামে রেখে একা একা নতুন করে পথ চলতে শুরু করলাম। তখন দুপুর প্রায় দুটো বাজে। ভুজবাসা এখান থেকে ৬ কিলোমিটার।

সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যেতে হবে ভুজবাসা, কারণ সময় অনেকটা মনে হলেও, এখানে এই পাহাড়ি নির্জনতায় সন্ধ্যাটা বেশ আগে আগেই নেমে আসে ঠাণ্ডা হাওয়া, মেঘ, কুয়াশা আর শীতের শিশিরের সাথে সাথে। তাই সেই দুই বন্ধুকে আবারো বিদায় জানিয়ে ছয় কিলোমিটার দূরের ভুজবাসার পথে চলতে শুরু করলাম।

চিরবাসার পথে নদী পেরোতে কাঠের সেতু। ছবিঃ লেখক

কিন্তু কিছুটা পথ পেরোতেই মনে হলো আগের যে পথটুকু পেরিয়ে এসেছি সেটা আসলে সামনের পথের তুলনায় প্রায় হাইওয়ের মতো ছিল! কারণ সামনের পথে যে এত এত বাঁক, এত এত খাড়া ট্রেইল, গঙ্গার উপরে প্রায় ঝুলে থাকা ভাঙা সেতু পেরোতে হবে, আর পেরোতে হবে দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ পাথর ঝরে পড়ার কত যে পাহাড়

Author

Write A Comment