লক্ষ্মীপুর নামকরণের সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, রাজা গৌরকিশোর রায়ের সহধর্মিণী রাণী লক্ষ্মীপ্রিয়া রায়ের নামানুসারে লক্ষ্মীপুর জেলার নামকরণ করা হয়। আবার অনেকের মতে, লক্ষ্মী নারায়ণের নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম রাখা হয় লক্ষ্মীপুর। নিজের জেলার ঠিক পাশের জেলাই লক্ষ্মীপুর। চাঁদপুর এক থেকে দেড় ঘন্টা লাগে লক্ষ্মীপুর যেতে। জীবনের তেইশটা বছর চাঁদপুরে কাটিয়ে দিয়েও লক্ষ্মীপুর যাওয়া হয়নি। তাই এবারে যখন তিনদিনের ছুটি পেলাম স্কুল থেকে, তখনই ঠিক করলাম লক্ষ্মীপুর যাব।

সর্বনাশা বটের শিকড়ের আধিপত্য। Source: লেখিকা

আমার সাথে যাওয়ার মতো তেমন কেউ নেই। চাঁদপুরে যে দুয়েকজন বন্ধুবান্ধব আছে, ওরা নিশ্চিত গাঁইগুঁই করবে যাওয়ার কথা বললে। হলোও তাই। একেকজনের একেক অজুহাত রেডি। আমি অবশ্য আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম, ঘাড় ধরে হলেও মেহেদিকে নিয়ে যাব। শেষ পর্যন্ত সেটাই হলো। আমি, মেহেদি আর আমার ছোট ভাই আরমানকে নিয়ে পা বাড়ালাম লক্ষ্মীপুরের দিকে।

ভোরবেলায় শীতলতার লকলকানি উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়লাম। তখনো কুয়াশা কাটেনি। চাঁদপুর থেকে রায়পুর-লক্ষ্মীপুরের হাইওয়েটা আগে বেশ ভালো ছিল। অনেক বছর পর এই রাস্তায় এসে খুব অবাক হলাম। রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ। কোথাও ভেঙে গেছে, আবার কোথাও কোথাও কাজ করানোর জন্য রাস্তা কাটা। অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগলো। লোকাল বাস হওয়ায় রায়পুর এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো বাসটা। এই ফাঁকে মেহেদি নেমে গরমাগরম শিঙাড়া নিয়ে এলো। তাই খেয়ে সকালের নাস্তা সারা হলো। লক্ষ্মীপুর যখন পৌঁছালাম, তখন বাজে পৌনে এগারোটা।

রাণীমহল। Source: লেখিকা

লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার ইউনিয়ন দালালবাজার। জমিদারবাড়ি দুটো ওখানেই আছে। লক্ষ্মীপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দালালবাজার কীভাবে যাব?’ উত্তর এলো, ‘সিএনজিতে করেই যেতে পারবেন। দশ টাকা করে ভাড়া।’

সিএনজিতে করে দালালবাজার আসার পথে বোকা বনে গেলাম। আমরা তো এই রাস্তা ধরেই এসেছি। জানা থাকলে লক্ষ্মীপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত না গিয়ে দালালবাজার নেমে গেলেই হতো।

অযত্ন আর আগাছা এই বিশাল জমিদার বাড়ির ধ্বংশের কারণ। Source: লেখিকা

যাই হোক, দালালবাজার নেমে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জমিদার বাড়ি কীভাবে যাব?’ তিনি বাজারের মধ্যকার রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। সাথে এও বললেন, ‘একটা লিচুগাছ পাবেন, বড়। ওটার পাশ দিয়ে গেলেই পেয়ে যাবেন জমিদার বাড়ি।’
পাঁচ মিনিট হাঁটার পর বাজারের আরেক দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম। উনি বাম দিকে একটি সরু গলির দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, ‘এই তো, এই রাস্তা দিয়েই।’

রাণীমহলের জানালা দিয়ে দীঘিনালা। Source: লেখিকা

তার দেখানো রাস্তা ধরে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। প্রবেশ পথের প্রথমেই স্কুলঘর টাইপের বিল্ডিং। আমি ভেবেই নিয়েছিলাম এটা তখনকার স্কুলই ছিল। পরে জানতে পারলাম, স্কুল নয়, ওটা ছিল কাচারী। জায়গায় জায়গায় প্লাস্টার করা। সাইনবোর্ডে লেখা, “ভূমি অফিস”। তারমানে এখন এটা দালালবাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ছায়া ঢাকা ইটের রাস্তা মাড়িয়ে সামনে এগুতেই দেখি, পুরোনো দালান নিজের গায়ে আগাছা আর পরগাছার জঙ্গল নিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম ভগ্নপ্রায় প্রবেশপথ দিয়ে। ঝকঝকে রোদ আর আলোতেও কেমন গা ছমছম করছে। শুধু জমিদার বাড়ি না বলে জমিদারবাড়ি-জঙ্গল বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে ওটাকে। কী গাছ নেই ওখানে! দালানকোঠা ধ্বংসকারী পরগাছা বট, বিভিন্ন ধরনের আগাছা, এমনকি কলাগাছও আছে বাড়ির মধ্যে। কিন্তু সেসব গাছ এখনো এই বিশাল বাড়ির অপূর্ব নির্মাণশৈলী ঢাকতে পারেনি। তবে এভাবে আরো কয়েক বছর পরিত্যক্ত থাকলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

খোয়াসাগর দীঘি। Source: লেখিকা

ভেতরে ঢুকে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এত নীরবতার মধ্যে কয়েকজনের গলার আওয়াজ শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। আসলে জায়গাটা এমন যে দিনে দুপুরে যদি কাউকে খুন করা হয়, কেউ টেরটিও পাবে না! উৎসাহের আতিশয্যে আমি একা একাই পা বাড়িয়েছিলাম সামনের দিকে, মানুষের গলার শব্দ শুনে থেমে গিয়েছি ভাই আর বন্ধুর জন্য। ওরা আসার পর তিনজনে একসাথে সামনে এগিয়ে গেলাম।

বাইরে থেকে ভগ্নদশা দেখে ভেবেছিলাম, হয়তো ছোটখাটো একটা রাজবাড়ি অবহেলায় পড়ে আছে। সামনের রাজগেট দিয়ে যখন ঢুকছি, তখনও এতোটা আশা করিনি। ভিতরে গিয়ে থ বনে গেলাম!

রাজারমহলে দোতলা যাবার সিঁড়ি। Source: লেখিকা

রাজবাড়ির এরিয়া বিশাল। প্রায় ৫ একর জায়গা জুড়ে গঠিত। বাড়ির প্রাচীর, অন্দর মহল, নির্মাণ সামগ্রী বিশেষ করে কয়েকটন ওজনের লোহার ভীম, বিরাটাকার লোহার সিন্দুক, নৃত্যশালা, নাট মন্দির, পূজা মন্ডপ, বহিরাঙ্গণ, জমিদারের অতিথিশালা, জলসা ঘর, একটু সামনে গেলেই জমিদার পরিবারের বসবাসের ঘর এবং সর্বশেষ ভিতরের ভবন রাণী মহল। রাণীমহলের খিড়কি দিয়ে একটা পুকুর দেখতে পেলাম। এটি রাণী পুকুর নামে পরিচিত। আবার এটি “খোয়া সাগর দিঘি” হিসেবেও পরিচিত। যার আয়তন ২২.০১ একর। সে সময়ে, যখন লক্ষ্মীপুর বৃহত্তর নোয়াখালীর অংশ ছিল, তখন এই জেলার প্রবাদ বাক্য ছিল,

“পাড় বড় ভিপিসিং,
পানি সুন্দর কৈলাস,
দিঘি বড় খোয়া সাগর”।

দীঘির পাড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক দীঘিতেই কয়েকটা ঘাট। ঘাটগুলোও বেশ মজবুত।

রাজারমহলের দোতলাই কেবল টিকে আছে। তিনতলার দেয়ালে বসে আছি। Source: লেখিকা

প্রায় ২৫ একর এলাকা জুড়ে রয়েছে খোয়া সাগর দীঘি। কুয়াশাকে স্থানীয় ভাষায় ‘খোয়া’ বলা হয়। দীঘির বিরাট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের ফলে এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে অন্য প্রান্তকে কুয়াশাময় মনে হতো বলে এ দিঘীর নাম খোয়া সাগর দীঘি। আনুমানিক ১৭৫৫ সালে জমিদার ব্রজ বল্লভ রায় মানুষের পানীয় জল সংরক্ষণে এ দীঘিটি খনন করেন। এ দিঘী নিয়ে বহু উপকথা ছড়িয়ে আছে। উপকথাগুলো অবশ্য জানা হয়নি।

খোয়া সাগর দিঘির পশ্চিম কোল ঘেষে বর্তমান ঢাকা-রায়পুর মহাসড়কের পার্শ্বে জমিদার বাড়ির শ্মশান। জায়গাটাকে মঠ বাড়ি বলে ডাকে স্থানীয়রা। এখানে অবশ্য আমরা যাইনি। জানতাম না জায়গাটার কথা। দীঘির পাড় থেকে বাড়ির ভেতরে এলাম আবার। অন্দরমহলের সামনে কিছু ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ওদেরকে পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি, উপরে ওঠার সিঁড়ি এখনো কোনোরকমে টিকে আছে। পুরোনো বাড়ির ছাদে ওঠার অদম্য ইচ্ছাটাকে রোধ করতে পারলাম না। টপাটপ উঠে গেলাম। যদিও একটা সিঁড়ি ভাঙা ছিল।

পুরাতন বাড়িগুলোতে দালানের নিচের দিকে এই খোপগুলো দেওয়া হয়; Source: লেখিকা

উপরেও একই অবস্থা। ঘরগুলো ভেঙে গেছে। দুয়েকটা দেয়াল টিকে আছে কেবল। এখানেও বটগাছের শিকড়ের রাজত্ব। আরোও একটা বাড়ির সিঁড়ি টিকে আছে। তবে ওটার ছাদ পর্যন্ত যেতে পারিনি। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়েই থেমে যেতে হয়েছে। এর পরের সিঁড়ি ভাঙা। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ছাদ থেকে মানুষের কথোপকথন শোনা যাচ্ছে। ভূত ভাবতে পারলাম না, কারণ সেখানে দুইজোড়া জুতোও আছে। ছেলেদের জুতো। ছেলে দুটো উপরে গেল কী করে?
মিনিটখানেকের মধ্যে আমাদের সামনেই নেমে এলো ওরা। একটা মোটাসোটা বট শিকড়ে ঝুলে নামলো। আমার সাহসে কুলালো না। পুরোনো বাড়ি, ভেঙে পড়ে যদি?

বহিরাঙ্গণ; Source: লেখিকা

এই দালানের ছাদ মোটা মোটা লোহার পাতের উপর টিকে আছে। সে সময়ে তো আর দালানের মধ্যে রড ব্যবহার করা হতো না, এরকম লোহার পাত দিয়েই ছাদগুলোকে মজবুত বানিয়েছিল। এই রাজ বাড়ির নির্মাণ সামগ্রী নাকি ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল। লোহার এই ভীমগুলোতে এখনও এমন নিদর্শন রয়েছে। এরকম বিশাল একটা লোহার পাত কেউ ছাদ থেকে ছাড়িয়ে রেখেছে, হয়তো বিক্রি করার আশাতেই। পারলে পুরো বাড়িটাই তুলে নিয়ে কটকটির দোকানে বেচে দিত! শুনেছি, কে যেন এই জমিদারবাড়ির বিচার আসন আর নৃত্য আসন চুরি করে নিয়ে গেছে।

দালালবাজারের জমিদার লক্ষ্মী নারায়ণের বাড়ি। লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণব প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে কলকাতা থেকে কাপড়ের ব্যবসা করতে দালালবাজার আসেন। তার পুত্র ব্রজবল্লভ স্বীয় দক্ষতা গুণে ব্যবসার প্রসার ঘটান। ব্রজবল্লভ পুত্র গৌরকিশোর কলকাতায় লেখাপড়ার সুবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহচর্যে আসেন এবং জমিদারি কিনে নেন। গৌরকিশোর ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা উপাধি লাভ করে। কেউ কেউ বলে, “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” কর্তৃক স্বীকৃত রাজা গৌরকিশোর রায়ের বংশধর নরেন্দ্র কিশোর রায় ১৮৩০-১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার বাড়ির ভিতরের দালান-কোঠাগুলো নির্মাণ করেন।

ছাদে লাগানো লোহার বিম। Source: লেখিকা

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক এজেন্ট হওয়ায় স্থানীয়রা তাদেরকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করেনি। ‘দালাল’ বলে ডাকতো। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জমিদারগণ পালিয়ে গেলে তাদের পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িটি রয়ে যায়। দালাল বাজার এন.কে উচ্চ বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ঠাকুর মন্দির এ পরিবারের অবদান।

৭২ বছর ধরে পরিত্যক্ত বাড়ির অবস্থা এর চেয়ে ভালো আশা করা যায় না। আফসোস লাগে, আমাদের এত সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আমরা এসব সংরক্ষণ করছি না।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে সড়কপথে গ্রীনল্যান্ড এক্সপ্রেস, আলবারাকা, আলম, ইকোনো অথবা ঢাকা এক্সপ্রেসে লক্ষ্মীপুর বাসস্ট্যান্ড যেতে পারেন। সময় লাগে সাড়ে ৪ ঘন্টা। বাস ছাড়ে সায়েদাবাদ থেকে। বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে করে দালালবাজার। ভাড়া নেবে ১০ টাকা। বাকিটুকু পায়ে হেঁটেই যেতে পারবেন। আর কেউ চাঁদপুর থেকে যেতে চাইলে, চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বোগদাদে চড়বেন। ভাড়া নেবে ৭০ টাকা। দুই ঘন্টায় পৌঁছে যাবেন।
ফিচার ইমেজ: offroadbangladesh.com

Author

Write A Comment