একটি অলস বিকেল কিংবা সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ততার এক ফাঁকে বুক ভরে প্রশান্তির স্বাদ নিতে কে না চায়? নাগরিক কোলাহল, অসহ্য যানজটের করাল থাবা থেকে আত্মাকে খোলা আকাশের নীল রঙের আলতো ছোঁয়া দিতে পারলে দাবানলে জ্বলতে থাকা মন যেন শান্ত হয়।
খোলা প্রান্তর, মাথার উপরে সীমাহীন আকাশ, নদীর পাড়ে জেগে ওঠা চর, সবুজ প্রকৃতি, নদীতে বয়ে চলা পাল তোলা নৌকা, উজান গাঙে মাঝির ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি গান সত্যিই একটি বিকেল কিংবা সন্ধ্যাকে রোমাঞ্চকর ও স্মৃতিমধুর করে তুলতে পারে। সময়কে স্মৃতিময় করে তুলতে ঘুরে আসতে পারেন চৌদ্দার চর এবং চর বিজয় থেকে।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের ছোঁয়া পাওয়া যাবে চৌদ্দার চর ও বিজয় চরে। নদীর মাঝখানে সবুজের আলতা মাখা ছোট্ট দ্বীপ, কখনো কখনো জলের ঢেউ আছড়ে পড়ে তীরে, সন্ধ্যায় আলতো করে সূর্য্যি মামা ডুবে যায় পশ্চিমের আকাশে, দুধ সাদা রঙের বক ও অন্যান্য পাখির ওড়াউড়ির মাতমে পুরো চর যেন নান্দনিকতায় ভরে ওঠে। সত্যিই মনোমুগ্ধকর রুপ যা না দেখলে বোঝা যায় না। আসুন জেনে নিই চর বিজয় ও চৌদ্দার চর সম্পর্কে বিস্তারিত।

চর বিজয়

ছবিসূত্রঃ bdtimes365.com

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে দক্ষিণ কোণে ৪০ কিলোমিটার দূরে সাগরের গভীরে এক মনোমুগ্ধকর চর জেগে উঠেছে যেখানে শিউলি ফুলের মত লাল কাঁকড়া চোখে পড়ে। সকাল, দুপুর, বিকেলে লাল কাঁকড়ায় ছেয়ে যায় খোলা প্রান্তর। নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা চরটি জেলেদের কাছে ‘হাইরের চর’ নামে পরিচিত। ২০১২ সালে একদল পর্যটক এই চরটিকে আবিষ্কার করেন। বিজয়ের মাসে চরটি আবিষ্কার করে বলে এই চরের নাম রাখা হয় ‘চর বিজয়’।

ছবিসূত্রঃ ভোরের বিডি

এই চরের সৌন্দর্যে ভ্রমণ পিপাসুরা মুগ্ধ হতে বাধ্য। চরটি তার সৌন্দর্যের মায়ায় পর্যটকদের বেঁধে রাখে। বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে ভেসে ওঠা ছোট চর দেখলে মনে হয় যেন অথৈ সমুদ্রের বুকে এক নতুন ঠিকানার দ্বার খুলে দিয়েছে এই চর।

চারপাশের অথৈ জল যেন আকাশের সীমানায় গিয়ে ঠেকেছে। আকাশ ও জলের মিতালি লক্ষ্য করা যায় দারুণভাবে। সারাক্ষণ পাখির কলতান, বিভিন্ন পাখিদের ওড়াউড়ি, সাদা বকের ছুটে চলা পর্যটকদের ভাবিয়ে তোলে। তীরে পা রাখতেই যেন শীতল জলের স্পর্শে ভিজে যায় পা।

ছবিসূত্রঃ BreakingNews.com.bd

প্রায় পাঁচ হাজার আয়তনের জায়গা জুড়ে জেগে উঠেছে এই চরটি। বনবিভাগ এই চরে প্রায় দুই হাজারের বেশি গোলপাতা, কেওড়া, ছইলা, সুন্দরী গাছ রোপণ করেছে। স্থানীয়দের মতে এই চরটি শীতকালে জেগে ওঠে, বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায় চর বিজয়। শীত মৌসুমে অসংখ্য অতিথি পাখি ভিড় জমায় চর বিজয়ে। শীতের শেষে আপন ঠিকানায় চলে যায় আগত পাখিরা।
শীতকালে অস্থায়ীভাবে বাসা বানিয়ে এখানকার জেলেরা মাছ ধরে ও শুঁটকি তৈরি করে। তবে অনতিবিলম্বে এই চরটিকে ঘিরে অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ। তারা বলেন, অনতিবিলম্বে এই চরটিকে পশু পাখির অভয়ারণ্য ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের আওতায় আনা হবে।

যাওয়ার উপায়

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে কুয়াকাটা পৌঁছাতে হবে। কুয়াকাটা থেকে স্পিডবোট কিংবা জাহাজ অথবা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় চড়ে পৌঁছাতে হবে চর বিজয়ে। স্পিডবোটে গেলে পনেরো মিনিট ও অন্য নৌযান দিয়ে গেলে পৌনে এক ঘণ্টা সময় লাগবে।

চৌদ্দার চর, আড়াইহাজার

ছবিসূত্রঃ bbarta24.ne
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় মেঘনা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা চরটি চৌদ্দার চর নামে পরিচিত। এটি একটি অনিন্দ্য সুন্দর চর হওয়া স্বত্ত্বে লোকজনের কাছে অতি পরিচিত নয়। ঢাকা থেকে মাত্র দেড়–দুই ঘন্টায় যাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জে।
চৌদ্দার চরের অপরুপ সৌন্দর্য ও জলরাশির উচ্ছ্বলতা যেকোনো সাধারণ মানুষের চোখ জুড়িয়ে যাবে। আপাতদৃষ্টিতে এই চরকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের মতো মনে হয়। এই চরে রয়েছে অনেক গাছগাছালি। বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ ছাড়াও অন্যন্য গাছ রয়েছে। বালির এই চরে পা রাখলে অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।
তাছাড়া রয়েছে নরম ঘাস, গ্রামের মেঠোপথ, জমিদার বাড়ি, বিশাল এলাকাজুড়ে কাশফুলের হাতছানি ইত্যাদি। সকল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন পর্যটকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

ছবিসূত্রঃ AllEvents.in

জলের বুকে ঝাঁপাঝাপি করতে ইচ্ছে করলেই জলে ঝাঁপ দিতে পারবেন। পানি ঘোলা হবে না। চরের বুকে উপভোগ করতে পারবেন হাঁসের ছুটে চলা, ঈগল, কাক ও গাঙচিলের ওড়াউড়ি, সাদা বকের স্নিগ্ধতা, রাজ হাঁসের রাজত্ব ইত্যাদি। নদীতে ট্রলারে ঘুরে অনেক মজা পাবেন। এছাড়া সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় চরকে মোহনীয় মায়ায় ভরে তোলে। চরে হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে যাবেন শামুক ও ঝিনুকের দেখা।

ছবিসূত্রঃ adarbepari.com

এই চরে শীতকালে দেখতে পাবেন দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা ক্ষেত, আলু, ক্ষীরাই, তেল, তিসি, বাংগি ইত্যাদির চাষ। শরতে চরে দিগন্ত বিস্তৃত কাশফুল হাতছানি দিয়ে যায়। কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় দর্শনার্থীরা। হাজার হাজার পাখি বিভিন্ন ঋতুতে চরকে মোহনীয় ও অনিন্দ্য সুন্দর করে তোলে। বর্ষায় চর ডুবে গেলেও পানি কমে গেলে পুনরায় চরটি জেগে উঠে।

ছবিসূত্রঃ travelmaniacfriends

চরের একপাশে মাছের ঘের, জেলেদের মাছধরা, জীবন যাপন, নৌকার চলাচল, কুচুরিপানার স্তূপ, বালির বীচ দর্শকদের ভাবায় দারুণভাবে। এছাড়াও চৌদ্দার চরে যাওয়ার পথে যা যা দেখতে পাবেন তা হল-

পুরনো বটগাছ যা কয়েকশো বছর ধরে নিভৃতে দাঁড়িয়ে আছে। গামছা শিল্প, পোশাক শিল্পের কারখানা। চাইলে কেনাকাটাও করতে পারবেন কমদামে। জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য। গ্রামীণ মেঠোপথে যারা সাইকেল চালাতে চান কিংবা খালি পায়ে হাঁটতে চান তাদের জন্য উপযুক্ত স্থান। কাদায় হাঁটার জন্য উপযোগী স্থান। মালাই চা, ডালপুরি সহ মুখরোচক খাবার খেতে পারবেন।

যাওয়ার উপায়

সায়েদাবাদ থেকে অভিলাষ পরিবহনে ৬৫ টাকা ভাড়ায় যেতে পারবেন মদনপুরে, সেখান থেকে সিএনজিতে চড়ে যাবেন আড়াইহাজার উপজেলায়। কলাবাগান থেকে মেঘলা পরিবহনেও যেতে পারবেন। ভাড়া নেবে ৬৫ টাকা। যেভাবেই যান সিএনজিতে করে আড়াইহাজার গিয়ে সেখান থেকে খাগকান্দা ঘাটে যেতে হবে। ঘাটের সাথেই চৌদ্দার চর। ইচ্ছে হলে ট্রলার রিসার্ভ করেও ঘুরতে পারবেন।

Author

Write A Comment