ট্রেকের শেষে পাহাড়ের চূড়ায় বসে নিচের পাহাড়ি ভ্যালীতে নির্জনে দাঁড়িয়ে থাকা ভুজবাসাকে দেখছিলাম। ১৫ দিন আগেও ভাবিনি যে আজ এখানে থাকবো। জানতাম না যে হুট করেই আমি কোনো দীর্ঘ পরিকল্পনা ছাড়াই গোমুখের সন্ধানে চলে আসবো। অথচ আজকে সেই গোমুখের বেজক্যাম্প বা অপরিচিত সেই ভুজবাসার পাহাড়ি ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবতেই দারুণ একটা সুখানুভূতি হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে।

আর আগামীকালই ছুটে যাবো গোমুখের খোঁজে, যেখান থেকে গঙ্গা, আমাদের পদ্মা আর স্থানীয় ভাগিরথী নদীর উৎপত্তি, সেই গ্লেসিয়ারের কাছে। যে বরফ মোড়া পাহাড়ের গ্লেসিয়ারের বরফ গলে গলে এই নদীর উৎপত্তি। যে নদীর তীরে প্রায় তিন যুগ আগে আমার জন্ম।

গঙ্গার বয়ে চলা। ছবিঃ লেখক

পাহাড়ের উপর থেকে ভুজবাসাটা দেখতে একটা ছোট্ট গোছানো গ্রামের মতো। একদম ডানে একটি সরকারী ট্রেকারস লজ, যার পাশেই সবুজ রঙের ভারি আর বিশাল কয়েকটি তাঁবু যেগুলো সরকারী লজের এক্সটেনশন আসলে। লজে জায়গা না হলে এই তাবুতে রাত্রি যাপন করা হয় নির্ধারিত ভাড়ার বিনিময়ে।

সরকারী লজের সামনেই সেনাবাহিনীর হলুদ রঙের দুই তিনটি ভবন। যার পাশ দিয়ে পাহাড়ি বর্ণীল ঘাস পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেই দেখা মেলে হ্যালিপ্যাড আর তাঁবু খাটিয়ে ট্রেকারদের থাকার জন্য খোলা মাঠ। পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে উচ্ছল যৌবনা গঙ্গা বা পদ্মা। মাত্র ৪ থেকে ৬ কিলোমিটার পরেই যার উৎপত্তিস্থল।

পাহাড় থেকে নামতেই হয় ভুজবাসার আশ্রমের গা ঘেঁষে ঘেঁষে। এই আশ্রমেও থাকা যায় নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে থাকা ও খাওয়াসহ। আশ্রমের সামনেই রয়েছে আর একটি বড় খোলা জায়গা যেখানে তাঁবু খাটিয়েছে একটি ট্রেকার্স টিম। আমি সরাসরি সরকারী লজে গেলাম। গিয়ে জানলাম লজের ভেতরে, মূল ভবনের ভেতরে কোনো সিট খালি নেই।

অনেক আগেই আর্জেন্টিনার ট্রেকার্স টিম সেটির সব রুম অনলাইনে বুকিং করে রেখেছিল। তবে চাইলে পাশেই ওদের তাঁবুতে থাকতে পারি প্রতি রাতে ৩৫০ রুপীর বিনিময়ে। আর সাধু বাবার আশ্রমেও থাকার ব্যবস্থা আছে ওই ৩৫০ রুপীর বিনিময়েই তবে খাওয়া সহ। যেটা একটু সাশ্রয়ী বটে।  কিন্তু কেন যেন সাধু বাবার আশ্রমে থাকার ইচ্ছা না হওয়াতে আমি সরকারী লজের ফাঁকা তাঁবুতেই থাকতে চাইলাম।

ট্রেক শেষের শেষে সুখের মুহূর্ত, ভুজবাসার সাইনবোর্ড। ছবিঃ লেখক

একটু নতুন স্বাদ আর অভিজ্ঞতা নিতে। কারণ এর আগে এমন পাহাড়ি নির্জন পরিবেশে তাঁবুতে থাকার অভিজ্ঞতা নেই আর সাধু বাবার আশ্রমে না আবার কোনো বিধি নিষেধ যদি থেকে থাকে সেই শঙ্কায়।

যে কারণে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা নিতে আমার জন্য আর আমার আরও দুই সহযাত্রীর জন্য দুটি বেড বুকড করে রাখলাম বা ওদের জন্য বলে রেখে নিজের তাঁবুতে ব্যাগপ্যাক রেখে লজের বারান্দায় এসে বসলাম পানি, সকালের অবশিষ্ট আলু পরাটা, চকলেট, খেজুর, চিপস নিয়ে আর গরম গরম চায়ের অর্ডার দিয়ে। ততক্ষণে আর্জেন্টিনা পার্টি রুম থেকে লজের খোলা চত্বরে বেরিয়ে মুক্ত বাতাসে ইয়োগা শুরু করে দিয়েছে।

খাবার মুখে দিয়ে, পানি খেতে খেতে একটু ক্লান্তি দূর হতেই প্রথমবারের মতো সামনে চোখ মেলে তাকালাম। আর তাকিয়ে থেকে তাকিয়েই রইলাম অভিভূত হয়ে। কেননা সারাটা পথ জুড়ে যে বরফ মোড়া পর্বতের আকর্ষণে আকর্ষণে এতটা কষ্ট করে এখানে এসেছি, তার একটি পাহাড় যে আমাদের ভুজবাসার ঠিক পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়েই হাসছে আমাদের দিকে তাকিয়ে।

ধবধবে শ্বেতশুভ্র তুষার জড়ানো পাহাড় চূড়ায় সূর্যের আলো পড়ে ঝিকঝিক করে হাসছে সে তুষার পাহাড়। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই খাওয়া শেষ করে উষ্ণ চায়ের মগ হাতে নিয়ে বারান্দার বাইরে এসে দাঁড়ালাম। আর দাঁড়িয়েই আগের চেয়েও বেশী অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম, মেঘ কেটে গিয়ে চোখে পড়াতে একে একে শিবলিঙ্গ, ভাগীরথি পিক ও ভাগীরথি গ্রুপের সাদা পাহাড়ের চূড়াগুলো দেখে।

তাবু থেকে ভাগীরথী পিক। ছবিঃ লেখক

তার মানে হলো আমরা যে পাহাড়ের দেয়াল ঘেরা ভুজবাসায় আছি সেই পাহাড়ের দেয়ালগুলোর ওপারের চারপাশেই রয়েছে শ্বেতশুভ্র পাহাড়ের সারি। হিমালয়ের সাদা পর্বতের রিজ। অনেকটা সময় নিয়ে সবাই চারদিকের তুষার জড়ানো পর্বতগুলো দেখলাম। এতটা কাছ থেকে যতটা কাছ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখতে পাইনি। কারণ এই সাদা পাহাড়গুলো কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও অনেক অনেক কাছে ছিল।

সন্ধ্যার আগমনী বার্তা এসে গেছে ততক্ষণে। পাহাড়ে পাহাড়ে ধুসর মেঘের আনাগোনা, ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে পর্বতের চূড়াগুলো। দিনের আলোতেই নীল আকাশের মাঝে দেখা গেল অর্ধ চাঁদের মৃদু হাসি। তার মানে আকাশ পরিষ্কার থাকলে সন্ধ্যার পরে আর রাতে চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে জ্যোৎস্নার সাথে অপূর্ব মিতালী করতে পারবো।

ক্যাম্প সাইট। ছবিঃ লেখক

ধূসর মেঘ আর ঘন কুয়াশায় পর্বতের চূড়াগুলো ঢেকে যাওয়ার পরে, দিনের বাকি আলোটুকুর সবটুকু উশুল করে নিতে আশ্রমের দিকে যেতে শুরু করলাম ওই পথে গঙ্গার একদম তীরে গিয়ে বসা যাবে দেখে আর বুঝতে পেরে। তাঁবুতে পানির বোতল রেখে আসতেই আমাদের সরকারী লজের বামে একটু নতুন ট্রেকার্স টিম তাদের হলুদ রঙের তাঁবু খাটাচ্ছে দেখে ওদিকটায় দেখে এলাম আর একটু হেঁটে এলাম।

তারপর আবার সেই আশ্রমের সামনের জংলি পথ ধরে, পাথরের মাঝ দিয়ে গঙ্গার তীরে গিয়ে একা একা বসলাম, হাঁটলাম, ছবি তুললাম চারপাশের কিছু। শুধু পাথরের উপরে পাথর সাজিয়ে দেয়াল আর কয়েকটি ঘর করা আছে গঙ্গার একদম তীর ঘেঁষে ধ্যান করার জন্য। একদম নির্জনে, এমন পাথুরে গম্ভীর ধ্যান ঘর দেখে একটু গা ছমছম করে উঠতেই একটু দূরে মাঠের মাঝেই তাঁবু খাটানো মানুষদের মাঝে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি এরা তারাই, যাদের সাথে চিরবাসায় কথা হয়েছিল।

গা ছমছমে পাথুরে প্রার্থনালয়। ছবিঃ লেখক

কিছু গল্প করে, কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে নিজ আবাসের বারান্দায় ফিরে এসেছিলাম ভীষণ ঠাণ্ডা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। ততক্ষণে দিনের আলো ফুরিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার আঁধার নামতে শুরু করেছে। তখনো আমার দুই সঙ্গীর দেখা না পেয়ে কিছুটা ভাবনায় পড়ে গেলাম। অবশ্য লজের বারান্দায় গিয়ে আর এক কাপ চা হাতে নিয়ে পায়চারী করতে করতে আর আবারো দিনের শেষ আলোয় ভাগীরথি পিক হেসে ওঠা দেখতে দেখতেই তাদের দেখা পেলাম দূর পাহাড়ের চূড়ায়। ভুজবাসার পাহাড়ি ছাদে। টেনশন দূর হওয়াতে এবার সোনালি সন্ধ্যা শেষে রূপালী রাতের অপেক্ষা করতে লাগলাম।

Author

Write A Comment