অ্যাডভেঞ্চার যদি হয় আপনার নেশা, দুর্জয়কে জয় করার আনন্দে যদি চান বিভোর হয়ে যেতে, সর্বগ্রাসী আতঙ্ককে যদি চান খুব কাছ থেকে অনুভব করতে কিংবা টিকে থাকার ঘুমন্ত আদিম প্রবৃত্তিগুলোকে জাগিয়ে তুলে যদি খুঁজে পেতে চান বেঁচে থাকার তীব্র আনন্দ, তবে আজকের এই লেখাটি আপনার জন্যই!

অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা আমাদের তেরো জনের দলটি গত বছর ছুটে গিয়েছিলাম মৌলভীবাজার, হামহাম নামের জীবন্ত জলপ্রপাতটির দেখা পেতে। তারচেয়েও বড় কথা, সেটা ছিল তিন নম্বর বিপদ সংকেতের মাঝে! মোটামুটি স্পষ্ট একটি বর্ণনার দিকে এগোনো যাক এবার।

যাত্রা শুরু হবে এখনই, ছবিঃ সাজিয়া আফরিন

২১ অক্টোবর, শনিবার, বেলা পৌনে এগারোটা। ছেমপাড়া, কলাবনপাড়া আর চা বাগান পার হয়ে আমরা বন বিভাগের কার্যালয়ে পৌঁছে যাই। সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল, আমরা যাওয়ার পর সেটা বেড়ে গেল আরো খানিকটা। নাম রেজিস্টার্ড হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের বলা হলো ফিরে যেতে। হামহাম যাওয়ার ঝিরিপথ দশ ফুট পানির নিচে, সেই সাথে আছে প্রচণ্ড স্রোত। তিন নম্বর বিপদ সংকেত থাকার কারণে টিলা পথটাও ভয়ংকর পিচ্ছিল। একেকটা টিলা ৬০-৭০ ফুটের মতো, কোনটা আবার একশো ফুটেরও বেশি উঁচু।

টিলার রাস্তাগুলো একদম সরু, রাস্তার পাশে খাদ। পিছলে রাস্তা থেকে খানিকটা পাশে গড়িয়ে পড়লেই কাউকে খুঁজে পাওয়াটা হবে কঠিন, বেশ কঠিন। এমন তেরোটা টিলা পার হয়ে সামনে এগিয়ে একটা ছোট ঝিরি পার হতে হবে। ব্যস, পৌঁছে যাব হামহামের কাছে। ঝিরিপথে যাওয়ার কোনো উপায় না দেখে টিলা পথেই হাঁটতে শুরু করলাম সবাই। সাথে ছিলেন আমাদের গাইড আলম ভাই। পেছনে ফেলে এলাম সব আদেশ, উপদেশ, বাধা, নিষেধ আর অনুরোধ!

প্লাবিত ঝিরিপথ, ছবিঃ জিম

উঠছি, নামছি, মাঝেমাঝে আশেপাশে তাকাচ্ছি। মেঘ চলে এসেছিল সাথেই। বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে। জোঁকও আমাদের পিছু নেয়া শুরু করেছে। আমাদের সবার গা থেকেই অন্তত তিন-চারটা জোঁক সরিয়ে ফেলতে হয়েছে এক ঘণ্টার মাঝেই। ভয়ংকর কাদা আর পিচ্ছিল রাস্তা। প্রতিবারই সাবধানী হয়ে পা ফেলতে হচ্ছে। পেছন ফিরে কারও সাথে কথা বলতে গেলে আছাড়ও খেতে হচ্ছে।

শেষের দিকের টিলাগুলো ভয়াবহ রকম খাড়া। মাঝে পার হতে হয়েছে ৬-৭ টা বাঁশের সাঁকো। একটায় আবার ধরার জন্য কোনো হাতল নেই।

দলের দুই জন, ছবিঃ জিম

সব টিলা পার হয়ে যখন ঝিরিপথের কাছে চলে এলাম, বিপত্তি সেখান থেকেই শুরু হলো। ছবিতে সবাই দেখে থাকবেন বাঁশ বাগানের ভেতর দিয়ে পায়ের পাতার সমান পানি আর পাথরে ভরা সুন্দর নিরীহ পথটা। সেটায় নেমে দেখলাম কোনো কোনো জায়গায় বুক সমান পানি! নিচে তীক্ষ্ণ চোখা পাথর। সেই সাথে ভয়াবহ স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল সবাইকে, খুবই কঠিন হয়ে পড়ছিল দাঁড়িয়ে থাকা। বন্ধু তন্ময় ভেসে গিয়েও ফিরে এসেছে আবার। তন্ময় আর জাহিদ ভাই অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে ঝিরিটা পার হতে অসম্ভব সাহায্য করেছেন আমাদের। এই দুইজনের বুদ্ধির জোরে বাকি এগারোজন পুরোটা ঝিরি কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই পেরুতে পেরেছি। সব কিছু ঠিকই ছিল তখন পর্যন্ত।

হামহামে আমরা! ছবিঃ লেখক

হামহাম যখন চোখের সামনে তখন বেলা তিনটা। পুরো পাচঁ ঘণ্টা লেগে গেল পৌঁছাতে। হামহামের ভয়ংকর গর্জন আর প্রলয়ঙ্করী রূপটা ধারণ করতে পারে, এমন ক্যামেরা এই জগতে এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি সম্ভবত। ছবি বা ভিডিও দেখে এর বিশালতাকে অনুভব করা একটি সর্বোচ্চ মাত্রায় অসম্ভব ব্যাপার! দুঃখ, বেদনা, রাগ, হতাশা, বিষণ্ণতা, গ্লানি আর তীব্র সুখ, এটার সামনে দাঁড়ালে সব কিছু একসাথে কাজ করে। আমরা অনেকেই একে দেখতে দেখতে নিজেদের ধরে রাখতে পারিনি।

বুনো উল্লাস! সুত্রঃ লেখক

যাই হোক, তিনটা তখনই বেজে গেছে। কিছুক্ষণ থেকেই আমরা ফিরে যাচ্ছিলাম, বৃষ্টির জন্য সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। এখান থেকে বের হতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে আমরা সবাই বুঝতে পারছিলাম। কেউ কোনো কথা না বলে হাঁটতে থাকলাম। তিনটা টিলা পার হওয়ার পরই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। পানি বেড়ে গেল, সাথে বৃষ্টিও। আরো ভয়ংকর ব্যাপারটা হচ্ছে আমাদের গাইডের কাছে কোন টর্চ ছিল না!

উত্তাল হামহাম, ছবিঃ জিম

অন্ধকারে রীতিমতো হাতড়ে হাতড়েই হাঁটতে হয়েছে আমাদের। পুরো জঙ্গলে তখন কবরের অন্ধকার নেমে এসেছিল। নিজের হাতও দেখতে পাচ্ছিলাম না কেউ। আমাদের সবার স্মার্টফোনগুলো ছিল একটা ব্যাগে, বৃষ্টিতে ভিজে অধিকাংশ ফোনেরই সলিল সমাধি হয়ে গেল, ফ্ল্যাশগুলোও ব্যবহার করতে পারিনি।

অপার মুগ্ধতা, ছবিঃ লেখক

সন্ধ্যা না, আমাদের ফিরতে ফিরতে শেষ পর্যন্ত রাতই নেমে এসেছিল। হাঁটতে হয়েছে টানা এগারো ঘণ্টা! এক মুহূর্তের জন্যও কেউ বিশ্রাম নিতে পারিনি। দাঁড়িয়ে পড়লেই জোঁক উঠে যাচ্ছিল গা বেয়ে। কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই আমাদের ফিরে আসতে পারার জন্য ভাগ্যকে ছোটখাটো একটা ধন্যবাদ দিতেই হবে। যত ধরনের আতংকের ভেতর দিয়ে মানুষ যেতে পারে, আমরা সম্ভবত তার প্রায় সবগুলোর মধ্য দিয়েই গিয়েছি, একটা দিনের মাঝেই। আমাদের অনেকেই এখনও সেটা নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে!

আমরা নিজেরাও আসলে এমন অভিজ্ঞতার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। অনেকটা মেঘ না চাইতে ‘ঝড়’ এর মতো হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আপনারা অনায়াসেই ঘুরে আসতে পারেন হামহাম, অন্তত জীবনে একবার হলেও। লেখার শুরুতে কেন হামহামকে ‘জীবন্ত’ বলেছি, এর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বুক ভরে তাজা বাতাস টেনে নিলেই সেটা বুঝতে পারবেন। ব্যাগ গোছানো শুরু করে দিন, এখনই সময়!

সতর্কতা:

ভরা বর্ষায় হামহামের প্রলয়ংকারী রূপটি দেখতে পাবেন, এমন সময়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে অবশ্যই মানসিক এবং শারীরিকভাবে তৈরি থাকতে হবে আপনাকে। ভালো গ্রিপের স্যান্ডেল, ছোট টর্চ, স্যাভলন, ব্যান্ডেইড, পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার, পানি এবং স্যালাইন অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। ট্রেকিংয়ের সময় প্রত্যেকে নিজের দিকে এবং সামনের সহযাত্রীর দিকে খেয়াল রাখবেন জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে। বৃষ্টি হলে জোঁকের যন্ত্রণাটা একটু বেশিই বেড়ে যায়।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে রাতের বাসে বা ট্রেনে উঠে চলে যাবেন শ্রীমঙ্গল। খুব ভোরেই শ্রীমঙ্গল থেকে সিএনজি নিয়ে চলে আসবেন কলাবনপাড়া। এখান থেকে স্থানীয় গাইড নিয়ে হামহামের পথে আপনার ট্রেকিং শুরু হবে। বন বিভাগের কার্যালয়ে আপনাকে পৌঁছাতে হবে বারোটার আগেই, বারোটার পর পৌঁছালে ওইদিনের জন্য হামহামে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যাবে না। কাজেই সময় সচেতনতা বাঞ্ছনীয়!

 ফিচার ইমেজ- নাজমুল সুজন 

Author

Write A Comment