আমার প্রিয় দুই নদী মেঘনা-ডাকাতিয়া কলকলিয়ে বয়ে গিয়েছে লক্ষীপুরের বুক চিরে। তাই লক্ষ্মীপুরের প্রতি অন্যরকম টান অনুভব করি। নারিকেল, সুপারি, ধানক্ষেত আর পানের বরজের সবুজ নিয়ে অপরূপ মহিমায় সেজেছে লক্ষ্মীপুর জেলা।

দালালবাজার থেকে কামানখোলা জমিদার বাড়ি দেখতে যাওয়ার পথেই পেলাম তার সেই শ্যামল সবুজ রূপ। দালালবাজার থেকে কামানখোলা জমিদার বাড়ি কাছেই। রিকশায় ২০ টাকা ভাড়া। পিচঢালা সরু রাস্তার দুই ধারে নারিকেল-সুপারি গাছের বাগান। এরকম বাগান আমাকে নস্টালজিক করে দেয়। কারণ আমার ছোটবেলার সবচেয়ে ভালো সময়গুলো কেটেছে এমনই সুপারি বাগানের গহীনতায়।

একপাশে পুকুর, একপাশে সুপারি বাগান, মাঝখানে সরু মেঠোপথ। সোর্স- লেখিকা

পাকা রাস্তা থেকে রিকশা নেমে গেল ডান দিকের মেঠো পথে। এখানটায় একটা তেরাস্তার মোড়ে কিছু দোকান আছে। দোকানের সামনে এক লোক সুপারির টুকরি নিয়ে বসে আছে। টুকরি ভরা সুপারি নিয়ে হয়তো দালালবাজার যাবে সে। কারণ দালালবাজারে বড়সড় একটা বাজার আছে। ওখানে নিয়ে বিক্রি করবে।
খানিকক্ষণ পরেই রিকশা থেমে যেতে বাধ্য হলো। রাস্তার কাজ চলছে, যানবাহন যেন না চলাচল করতে পারে সেজন্য বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়েছে রাস্তার এমাথা-ওমাথা জুড়ে। আমরা রিকশা থেকে নেমেই হাঁটতে শুরু করলাম। সেই মেঠো রাস্তার বামপাশে দেখি পানের বরজ!

প্রথমবারের মতো পানের বরজ দেখতে পেলাম। মাঝখানে দুই ফুট দূরত্ব রেখে পানের চারাগুলো সমান্তরাল লাইনে রোপণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি চারার সাথে বাঁশের শলা বা খুঁটি পুঁতে তার সাথে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পানের লতাগুলো। রোদ এবং গরু-ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই মনে হয় বরজের চারদিকে ৫/৬ ফুট উঁচু করে বাঁশের শলা ও খুঁটি দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। একই সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে উপরের মাচান।

রোদের ঝলকানিতে পানের বরজের ছবিটা ঝলসে গিয়েছে। সোর্স- লেখিকা

পানের এই বরজ দেখেই মনে হলো, সব কৃষক পানের চাষ করে না। পান উৎপাদনের জন্য যারা বরজ তৈরি করে তাদের বারুই ডাকা হয়। যেহেতু বরজ তৈরি মুসলমানদের আগমনের পূর্বের পেশা, সে কারণে মূলত সকল বারুই ছিল হিন্দু এবং সমাজে তাদের স্থান শ্রেণিবিন্যাসে বেশ উপরেই ছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে অনেক বারুই জমিদারি ও তালুকদারির মালিক হয়। মুসলমান শাসনামলে কৃষকদের মাঝে বারুই শ্রেণি ছিল সবচেয়ে বেশি ধনী। কে জানে, কামানখোলার জমিদাররা বারুই ছিল কিনা!

রিকশাচলার উপযোগী রাস্তাটা কিছুক্ষণ বাদেই পায়ে চলা সরু পথ হয়ে গেল। সরু ওই পথের দুই ধারে সার বাঁধা সুপারি গাছ। সুপারি গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে একটা লালচে কাঠামো দেখা গেল। মেহেদি বললো, ‘ওই তো জমিদার বাড়ি!’

সাদা রঙে জমিদারবাড়ির আসল সৌন্দর্য হারিয়ে গিয়েছে। সোর্স- লেখিকা

ওই পথ ধরে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে যেতেই হাতের ডানপাশে একটা বিশাল দীঘি দেখতে পেলাম। এটা জমিদারবাড়িরই দীঘি। রাস্তার শেষ দিকে যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম, ততই মনে হলো লালচে কাঠামোটা মোটেও জমিদারবাড়ি নয়। ভালো করে চোখে পড়তেই বুঝলাম, ওটা একটা মঠ। প্রায় তিনতলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু।

মঠ দেখলেই আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে। মঠগুলোতে তো ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল। কেউ কেউ ধারণা করে মঠে ভক্তদের শিক্ষাও দেওয়া হতো। ধর্মীয় শিক্ষা। তাহলে এগুলোর আকৃতি এমন লম্বাটে কেন? আমি যত মঠ দেখেছি, সবগুলোই ছিল লম্বা গড়নের। এবং সবগুলোরই কেবল একতলায় ঢোকার উপায় দেখেছি। যদিও দোতলা, তিনতলা বা এর উপরে যত তলাই থাকুক, তার প্রমাণ থাকে, কিন্তু কোনো মঠেই উপরে ওঠার সিঁড়ি দেখিনি। উপরের তলাগুলোতে যদি যাওয়ার উপায় না-ই থাকে, তাহলে ওগুলো বানাতো কেন? আর যদি উপরের তলাগুলো ব্যবহৃত হতোই, তাহলে, ওখানে কীভাবে যেত?

ওই যে একপাশে রান্নাঘর টাইপের কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। সোর্স- লেখিকা

প্রশ্ন প্রশ্নের জায়গাতেই থেকে যায়। উত্তর দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। মঠ দেখে জমিদার বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। এখানেও একটা পুকুর আছে। পুকুরের পাশ দিয়ে না গিয়ে পায়ে চলা ওই সরু পথটা দিয়েই পা বাড়ালাম।

সাদা নতুন রঙ করা একটা দোতলা ভবন। লম্বাটে ভবনটির একপাশে একচালা ঘর কয়েকটি, আরেক পাশে একটা মাটির ঘর। উঠোনে বসে একজন মহিলা কাজ করছেন। তা দেখেই বুঝতে পারলাম, এটায় এখনো বসতি আছে। আর সেজন্যই হয়তো এটা টিকে আছে এখন পর্যন্ত। নইলে দালালবাজারের পরিণতি বরণ করতে হতো এটারও। আবার, বসতি আছে বলেই ভিতরের দিকে যাওয়ার সাহস করলাম না। হয়তো গেরস্থরা বিরক্ত হবে। বিরুলিয়ার এরকম অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর ছিল না।

জমিদারবাড়ির পুকুরঘাট। সোর্স- লেখিকা

জমিদার বাড়িটা সম্পর্কে খুব অল্প কিছু তথ্যই পাওয়া গিয়েছে। জমিদার রাজেন্দ্রনাথ দাস পুত্র ক্ষেত্রনাথ দাস ও পৌত্র যদুনাথ দাস এবং যদুনাথ দাসের পৌষ্যপুত্র হরেন্দ্র নারায়ণ দাস চৌধুরী পর্যায়ক্রমে রায়পুরে জমিদারী করেন। দালাল বাজারের জমিদারদের সাথে সখ্যতা থাকায় এ জমিদারের বাড়ির নিকটবর্তী কামান খোলায় ভূ-সম্পত্তি ক্রয় করে জমিদারী আবাস গড়ে তোলেন।

বাড়ির সদর দরজায় খালের পাড়ের জল টংগী, লাঠিয়াল ও রক্ষী বাহিনীর আবাস, সামনে দ্বিতল লম্বা বিরাটাকারের পূজামণ্ডপ আছে। সুরক্ষিত প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতর বাড়িতে রয়েছে অপূর্ব সৌন্দর্যের রাজ প্রাসাদ। বাড়ির অভ্যন্তরে ভূগর্ভস্থ নৃত্য ও সালিশী কক্ষ তথা ‘আঁধার মানিক’ নামে খ্যাত কক্ষ নিয়ে নানা মুখরোচক কাহিনী রয়েছে।

হাতি মারা গেছে কিন্তু সে হাতির হাড় রয়ে গেছে এখনো। আছে লক্ষ্মী নারায়ণ দেব বিগ্রহ। কিন্তু আমরা যেহেতু ভিতরে ঢুকতে পারিনি, তাই এসবের কিছুই দেখা হয়নি। হয়তো একটু অনুরোধ করলে দেখতে পারতাম। আফসোস হচ্ছে এখন। একটু চেষ্টা করলেই ভালোভাবে দেখা যেত সবটা। কেন যেন এসব ক্ষেত্রে এত বেশি হীনমন্যতায় ভুগি, জানি না।

প্রায় তিনতলা উঁচু মঠ, কিন্তু উপরে যাওয়ার সিঁড়ি নেই। সোর্স- লেখিকা

পানের বরজের পাশের ওই মেঠোপথ ধরে ফেরার সময় একজন পাগল বুড়ো লোক কী যেন বলতে বলতে তেড়ে এল। লোকটা কী বলল বুঝলাম না। একে দেখে আমার মনে হলো, এই লোকটা যদি সুস্থ হতেন, এই জমিদার বাড়ি সম্পর্কে অনেক কিছুই বলতে পারতেন। হয়তো, হয়তো ইনি এই জমিদারদের খুব কাছের লোকই ছিলেন! কে জানে? হলেও তো হতে পারে!

দোতলায় দরজার আদলও আছে। সোর্স- লেখিকা

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়কপথে রয়্যাল (এসি), জননী, ইকোনো অথবা ঢাকা এক্সপ্রেসে লক্ষ্মীপুর বাসস্ট্যান্ড যেতে পারেন। সময় লাগে সাড়ে ৪ ঘন্টা। বাস ছাড়ে সায়েদাবাদ থেকে। সড়কপথের ঝক্কি আর জ্যাম এড়াতে লঞ্চেও যেতে পারেন ঢাকা থেকে। আর কেউ চাঁদপুর থেকে যেতে চাইলে, চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে আনন্দ বাসে চড়বেন। ভাড়া নেবে ৭০ টাকা। দুই ঘন্টায় পৌঁছে যাবেন।

লক্ষ্মীপুর এলে আলাদা করে কামানখোলা দেখতে আসার কিছু নেই। দালালবাজার আর কামানখোলা একবারেই দেখে যেতে পারেন।
লক্ষ্মীপুর বাস স্ট্যান্ড কিংবা রায়পুর বাস স্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে করে দালালবাজার চলে আসবেন। ১০ টাকা করে নেবে। ওখান থেকে রিকশায় কামানখোলা। রিকশা ভাড়া ২০ টাকা।
ফিচার ইমেজ- onuvromon.com

Author

Write A Comment