বাংলার ভূমি প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের ভূমিতে প্রাচীনকাল থেকে নির্মিত হচ্ছে অসংখ্য স্থাপনা, জমিদার বাড়ি। কালের স্রোতে অনেক নির্মাণ ম্লান হয়ে গেলেও স্থাপনাগুলোর তাৎপর্য, মাধুর্য রয়ে গেছে। প্রাচীন স্থাপনার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় নির্মিত হচ্ছে আধুনিক স্থাপনা।
গাইবান্ধার ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার, নারায়ণগঞ্জের তাজমহল, হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড,  বরিশালের গুটিয়া জামে মসজিদ ইত্যাদি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। আধুনিক স্থাপনাগুলোও এক সময় কালের ধারক হয়ে থাকবে। সময়ের সাথে সাথে এই স্থানগুলো সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে। স্বল্প খরচে এই স্থাপনাগুলোতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন। নিচে উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর বর্ণনা দেয়া হলো।

তাজমহল, নারায়ণগঞ্জ

ছবিসূত্রঃ Pan Pacific Blog
বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য হিসেবে আগ্রার তাজমহল বিখ্যাত। মুঘল সাম্রাজ্যের উল্লেখযোগ্য ও অন্যতম নিদর্শন আগ্রার তাজমহলের আদলে বাংলাদেশের নারায়গঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ে তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশের তাজমহল। চলচ্চিত্র নির্মাতা আহসানুল্লাহ মনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার পেরাব গ্রামে ১৮ বিঘা জমির উপর বাংলার তাজমহল নির্মাণ করেছেন। ইতালি থেকে মার্বেল পাথর ও বেলজিয়াম থেকে হীরা আমদানি করে বাংলার তাজমহল নির্মাণ করেছেন বলে দাবি করেন আহসানুল্লাহ মনি। তিনি আরো দাবি করেন গম্বুজ তৈরির জন্য ১৬০ কিলোগ্রাম ব্রোঞ্জ আমদানি করেছেন।

দামি পাথরে মোড়ানো তাজমহলের মূল ভবন বাংলার সাধারণ মানুষের নজর কাড়ে মূহুর্তেই। এছাড়া মূল ভবনের পাশে রয়েছে ফুলের বাগান, বসার সুব্যবস্থা, চারকোণায় রয়েছে চারটি বড় মিনার। তাজমহলের চারদিকের ফুলের বাগানে হরেক রকম ফুল ফোটে প্রতি বছর। আর ফুলের ঘ্রাণে মত্ত হয়ে ফড়িং, প্রজাপতিরা উড়ে বেড়ায় বাগানের উপর দিয়ে।

ছবিসূত্রঃ flickr.com

তাজমহলের সামনে রয়েছে পানির ফোয়ারা যা দর্শনার্থীদের মন হরণ করে। এছাড়াও এখানে রাজমনি ফিল্ম সিটি স্টুডিও, রাজমনি ফিল্মসিটি রেস্তোরাঁ এবং খাবারের সুব্যবস্থা আছে। এছাড়া তাজমহলের কাছে রয়েছে মিশরের পিরামিডের নকল করে বানানো মিরামিড। যেখানে গেলে আপনি দেখতে পাবেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য, সেমিনার কক্ষ, সিনেমা হল, শুটিং স্পট ইত্যাদি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী বাংলার তাজমহল ও পিরামিড দেখতে আসে।

প্রবেশমূল্য ও প্রবেশের সময়সূচী

১৫০ টাকা মুল্যের টিকিট কেটে সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ঘুরতে পারবেন বাংলার তাজমহলে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরত্বের তাজমহলে যাওয়া যায় খুব সহজে। ঢাকা- চট্রগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁও মদনপুর হয়ে তাজমহল যাওয়া যায়। মদনপুর নেমে সেখান থেকে সিএনজি কিংবা স্কুটারে করে তাজমহলে পৌঁছাতে হবে। ঢাকা- সিলেট মহাসড়কে কাঁচপুর, রুপগঞ্জ হয়ে বরপা দিয়ে তাজমহলে যাওয়া যায়।

ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার, গাইবান্ধা

ছবিসূত্রঃ প্রথম আলো
গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত মদনের পাড়া গ্রামে ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার অবস্থিত। জানা যায়, ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর মদনের পাড়া গ্রামে আট বিঘা জায়গা জুড়ে এই স্থাপনাটি গড়ে তোলা হয়। স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী তার মেধা ও মননশীলতার পরিচয় দিয়ে ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার গড়ে তোলেন।

এই স্থাপনাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পুরো ভবনটি মাটির তলায় অবস্থিত। ভবনের ভেতরে রয়েছে লাইব্রেরি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, খাওয়া দাওয়ার সুব্যবস্থা, খেলাধুলার সুব্যবস্থা। এছাড়াও বিদ্যুৎ সুবিধা, ইন্টারনেট সুবিধা, ২৪টি কক্ষ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, উন্নতমানের শব্দযন্ত্র ইত্যাদির ব্যবস্থাও রয়েছে। ভবনটি বেশ কয়েকটি ব্লকে বিভক্ত। বিশাল ভবনের একটির সঙ্গে অন্যটি সংযুক্ত রয়েছে দরজা ও বারান্দা দিয়ে।

ছবিসূত্রঃ Prothom Alo

ফ্রেন্ডশীপ সেন্টার ভবনের ছাদ মাটির সমতলে রাখা হয়েছে। সবুজ ঘাসে ঘেরা ছাদের উপরে চোখ পড়লে মূহুর্তেই অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। ৩২ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই ভবনটি দেখলে মানুষের মনে বিস্ময় জাগে প্রতিনিয়ত, সেই সাথে জাগে কৌতূহল। এই ভবনটি বেশ নিরিবিলি ও শান্ত। দেশীয় উপকরণ দ্বারা নির্মিত এই ভবনের চারপাশে রয়েছে আলো-বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা। এই ভবনটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে আট কোটি টাকা এবং সময় লেগেছে দুই বছর।

ছবিসূত্রঃ asianbarta24.com

মাটির সমতলে সবুজ ঘাসের আচ্ছাদনে এই ভবনটি দেখলে মনে হয় প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের আদলে এটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে অনেক ঔষুধি গাছের বাগান রয়েছে। পুরো ভবনটিকে দেখাশোনা করার জন্য ১৯ জন কর্মকর্তা কর্মচারী নিযুক্ত করা হয়েছে। বুয়েট থেকে পাশ করা স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায় এখানে।

যেভাবে যাবেন

গাইবান্ধা শহর থেকে ফ্রেন্ডশীপ ভবনটি ৫ কিলোমিটারের পথ। শহরের বাস টার্মিনাল থেকে টমটম অথবা অটোরিকশায় ২০-২৫ টাকা ভাড়া দিয়ে গাইবান্ধা-বালাসীঘাট সড়ক হয়ে ফ্রেন্ডশীপ ভবনে পৌঁছাতে পারবেন।

গুটিয়া মসজিদ, বরিশাল

ছবিসূত্রঃ vromon guide
বরিশালের উজিরপুর থানার গুটিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে গুটিয়া মসজিদ অবস্থিত। বলা হয়ে থাকে, এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম জামে মসজিদ হলো গুটিয়া মসজিদ। গুটিয়া মসজিদ হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিতি পেলেও এর আসল নাম বায়তুল আমান। লোকের মুখে মুখে প্রচলিত নামে মসজিদটি সকলের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে।

২০০৩ সালে সরফুদ্দিন আহম্মেদ সন্টু মিয়া গুটিয়া মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন যা শেষ হয় ২০০৬ সালে। শুধু জামে মসজিদ নয়, ১৪ একর জমির উপর মসজিদ সহ নির্মাণ করা হয়েছে ঈদগাহ কমপ্লেক্স। মসজিদটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ২১ কোটি টাকা।

ছবিসূত্রঃ Flickr

এই মসজিদের নির্মাণশৈলিতে ইউরোপ ও মধ্য প্রাচ্যের বড় বড় মসজিদের ছাপ পাওয়া যায়। গুটিয়া মসজিদের পাশে রয়েছে ফুলের বাগান, ডাকবাংলো, গাড়ি পার্কিং, লেক, পুকুর ইত্যাদি। এই মসজিদের মিনারটি ১৯৩ ফুট উঁচু। মসজিদটির সেবায় ৩০ জন কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছে। দর্শনার্থীরা এই মসজিদে আসে এবং এর নান্দনিকতা উপভোগ করে।

যেভাবে যাবেন

দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বরিশাল জেলা শহরে যাবেন। বরিশাল শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে গুটিয়া মসজিদটি অবস্থিত। শহর থেকে সিএনজি কিংবা অটোরিক্সায় গুটিয়া মসজিদ দেখতে যেতে পারবেন।

Author

Write A Comment