সবুজ শ্যামল বাংলার অপরূপ রুপের অধিকারী জেলা রাঙামাটি। পাহাড়ের সবুজ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে চোখ জুড়ানোর জন্য অনবদ্য এই রুপসী জেলা। এখানে পাহাড়ের পরতে পরতে যেন স্বর্গ সুখের অনিন্দ্য ছোঁয়া লুকিয়ে আছে। প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকরা প্রতি বছর এখানে ভিড় জমায় প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপ দেখতে। রাঙামাটি জেলার সাজেক ভ্যালি, শুভলং ঝর্ণা, ধুপপানি ঝর্ণা দেখলে মনে হয় কোনো এক দক্ষ চিত্রশিল্পী যেন মনের মাধুরী মিশিয়ে অপরুপ সুন্দর এই স্থানগুলো তাঁর নিপুণ কালির আঁচড়ে এঁকেছেন। সত্যিই মনোমুগ্ধকর জায়গা এই রাঙ্গামাটি জেলা।

প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসে এই অপার সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে। প্রকৃতিপ্রেমীরা ভালবেসে রাঙামাটিকে প্রকৃতির রুপসীকন্যা বলে ডাকে। অনেকে ভাবেন ঘোরাঘুরি করলে অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু তা নয়। রাঙ্গামাটি জেলায় ঘোরাঘুরি স্বল্প খরচেও করা যায়। তবে জানতে হবে কিছু কায়দা-কানুন। আসুন জেনে নিই রাঙ্গামাটি জেলার কোন স্থানগুলোতে ঘুরে আপনি পেতে পারেন স্বর্গীয় আবেশ তা সম্পর্কে।

সাজেক ভ্যালী

ছবিসূত্রঃ ittefaq.com
সাজেকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ২৪ ঘন্টার মধ্যে এখানে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন হয়। দিনের কখনো গরম, কখনো বৃষ্টির ঢল আবার কখনো কুয়াশায় ছেয়ে যায় সাজেক ভ্যালি। সাজেক ভ্যালীকে মেঘের রাজ্যও বলে থাকে কেউ কেউ। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১,৮০০ ফুট উপরে অবস্থিত সাজেকে আপনি দেখতে পাবেন ভেজা তুলোর মতো মেঘ, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ছুটে যাওয়া মেঘেদের দেখলে মনে হবে মেঘেরা যেন কানামাছি খেলছে। সাজেকে সকাল হয় ভোরের সোনালী সূর্যের হাতছানি দিয়ে।

ছবিসূত্রঃ Ettefaq.com

একদিকে মেঘাচ্ছন্ন ভোর, অপরদিকে সূর্যের আলো-ছায়া খেলা অপরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করে। সবচেয়ে সুন্দর সূর্যোদয় দেখা যায় হেলিপ্যাড থেকে। পড়ন্ত বিকেলে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে সাজেকের পরিবেশ যেন অপার মাদকতায় ভরে যায়। সূর্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই মনোনুগ্ধকর। তাছাড়া রাতের সাজেক যেন ভিন্ন আঙ্গিকে ধরা দেয় পর্যটকদের কাছে। আকাশের অজস্র তারা সাজেককে পাহারা দেয় পুরো রাত জুড়ে। সাজেকের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও দর্শনার্থীরা উপভোগ করতে পারে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, চাইলে আদিবাসীদের রিসোর্টে থাকতে পারে স্বল্প অর্থের বিনিময়ে।

ছবিসূত্রঃ ittefaq.com

সাজেক রাঙামাটি জেলায় হলেও ভৌগোলিক কারণে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে সাজেকে যাওয়া সহজ। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার হলেও দীঘিনালা থেকে দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। সাজেক আর্মিদের নিয়ন্ত্রণে আছে। তাই সাজেক ভ্রমণ করতে হলে বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হবে। ভ্রমণপিপাসুরা সাজেকে যেতে পারেন বর্ষা কিংবা শীতের মৌসুমে। এই সময়ে দারুণভাবে প্রকৃতিকে উপভোগ করা যায়।

সাজেকে থাকার জন্য অনেক রিসোর্ট আছে। সারা রিসোর্ট, ইমানুয়েল রিসোর্ট, জলবুক কটেজ, আলো রিসোর্ট, মেঘ মাচাং, লুসাই কটেজ ইত্যাদি। এছাড়া আদিবাসী ঘরেও থাকা যায় অল্প খরচে। তবে রিসোর্টে থাকার খরচ একটু বেশি।

ধুপপানি ঝর্ণা

ছবিসূত্রঃ dainiksomoysangbad24.com
ধুপপানি শব্দের অর্থ হল সাদা পানির ঝর্ণা। সমতল থেকে এই ঝর্ণার উচ্চতা ১৫০ মিটার। এই ঝর্ণার পানির পড়ার শব্দ প্রায় দুই কিলোমিটার দূর থেকে শোনা যায়। দর্শনার্থীরা এই ঝর্ণার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়। এটি রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত। ধুপপানি ঝর্ণা দেখার আগে ও পরে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ভালো গ্রিপের জুতা পরতে হবে।

স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। ঝর্ণার সৌন্দর্য নষ্ট হয় এমন কাজ করা যাবে না। ঘুরতে যাওয়ার সময় পাসপোর্টের ফটোকপি, জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি সাথে রাখা নিরাপদ। কারণ কর্তব্যরত পুলিশ ও আর্মিরা চেক করে। ধুপপানি ঝর্ণা দেখার জন্য ঢাকা থেকে কাপ্তাই এবং কাপ্তাই থেকে বিলাইছড়ির উদ্দেশ্যে যেতে হবে। বিলাইছড়িতে থাকার ইচ্ছে থাকলে স্থানীয় বোর্ডিংয়ে থাকতে পারবেন। আর খাওয়া-দাওয়া সেরে নেয়া যায় বিলাইছড়ি বাজারের হোটেল থেকে। সেখানে বকুলের দোকান ও ভাতঘরে অল্প দামে খাবার খেতে পারবেন।

সিম্বল অব রাঙামাটি খ্যাত ঝুলন্ত ব্রীজ

ছবিসূত্রঃ ভ্রমণ গাইড
রাঙামাটি জেলার পথে পথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ রূপের পসরা সাজিয়ে বসে আছে অনেক পর্যটন স্থান। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কাপ্তাই হ্রদের উপরে নির্মিত ঝুলন্ত ব্রীজ যা স্থানীয়দের কাছে ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ বলে খ্যাত। এই ব্রীজটি ৩৩৫ ফুট লম্বা। বিভিন্ন সিনেমা, শর্টফিল্ম, মিউজিক ভিডিও, নাটকের শুটিং করা হয় এই ঝুলন্ত ব্রীজে। কাপ্তাই হ্রদের দুপাশের পাহাড়কে সেতু বন্ধনের জুড়ে দিয়েছে রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রীজ। ব্রীজের এক পাশে রয়েছে শিশুদের খেলার জন্য স্লিপার, দোলনা ইত্যাদি। এছাড়াও এখানে আছে পিকনিক স্পট, অডিটোরিয়াম, পার্ক ইত্যাদি। ব্রীজের নিচে কাপ্তাই লেকের পানিতে বোট চলে। এখানে প্রতি ঘন্টা হিসাবে ২০০/৩০০ টাকা দিয়ে কাপ্তাই লেকে ঘুরা যায়। বছরের যেকোনো সময়ে ঝুলন্ত ব্রীজ দেখতে যেতে পারবেন। তবে শীত মৌসুমে ঘোরাঘুরি উত্তম। বর্ষায় ঝুলন্ত ব্রীজ পানিতে ডুবে যায়। তাই বর্ষায় গেলে খোঁজ নিয়ে যাওয়া ভালো।

রাজবন বিহার

ছবিসূত্রঃ dw.com
রাজবন বিহার বাংলাদেশের বৌদ্ধদের বৃহত্তম বিহার। রাঙামাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে রাজবন বিহারের অবস্থান হলেও এখানে কোলাহল নেই, যানযট নেই। ১৯৭৭ সালে বনভান্তে লংদু থেকে রাঙ্গামাটির রাজবন বিহারে এসে বসবাস শুরু করেন। তারপর থেকে রাজবন বিহার খ্যাতি লাভ করেছে।

রাজবন বিহার ২২ একর ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে বর্তমানে অনেকগুলো ভবন নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে রয়েছে অনেক কক্ষ ও নিদর্শন। যেমন, প্যাগোডা, উপয়াসনালয়, উপসনালয়ের দুদিকে বাতিঘর, ভিক্ষু সংঘের দোতলা বাসভবন, ভাবনা কুঠির, ভোজনালয়, শ্রদ্ধেয় বণভান্তের ভাবনা কুঠির, ভোজনশালা, চংক্রমণ ঘর ইত্যাদি।

২২ একর জমির মধ্যে ২টি গুহা, ভিক্ষু সীমা, রাজবন বিহার দেশনালয় রয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি এখানে একটি লাইব্রেরী নির্মান করা হয়েছে ভিক্ষুদের জন্য। পর্যটকরা রাজবান বিহারে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। তবে এখানে টুপি পরে প্রবেশ করা নিষেধ।

Author

Write A Comment