ঢাকা থেকে রংপুরের দূরত্ব প্রায় ৩৩৫ কিলোমিটার। সড়ক বা রেল পথে পৌঁছাতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা (কখনো কখনো তার থেকেও বেশি)। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলাটিকে বৃহত্তর বঙ্গ প্লাবন ভূমির অংশ মনে করা হয়। ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই জেলাটি দেশের বহু জেলা থেকে একদমই আলাদা।

বন্যায় রংপুরের বেশ কিছু অঞ্চল প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হয়, বিশেষ করে নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী চরগুলো। বিগত বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা পূর্বের তুলনায় বেশি ছিল এবং আমাদের রংপুর যাত্রাটা শুরু হয়েছিল বন্যার পরপরই।

রংপুর শহর; source: Wikipedia

এক বৃহস্পতিবার রাতে, ঢাকা থেকে হায়েস ভাড়া করে আমরা ১১ জন রওনা হই রংপুরের উদ্দেশ্যে। তালিকায় ছিল রংপুর, কুড়িগ্রাম, ধরলা নদী ভ্রমণ ও মাঝ পথে বগুড়ার দই ও খিরসার স্বাদ নেয়া। সারা সপ্তাহের ব্যস্ততা ও সেদিনের অফিস শেষে রাতের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ক্লান্তি নিয়ে। তবে পথের উপর নজর ছিল সবার। অন্ধকার নিংড়ে যতটুকু রাতের পথের সৌন্দর্য দেখে নেয়া সম্ভব তাতে কার্পণ্য করলাম না আমরা কেউই।

যমুনা সেতুর অসাধারণ সৌন্দর্য সম্পর্কে আমরা সবাই-ই জানি। যাদের কাছ থেকে সেই সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি তারাও হয়তো কখনো দেখে থাকবেন ইউটিউব বা অন্য কোনো মাধ্যমের ভিডিওতে। সে রাতেই প্রথম যমুনা সেতুটিকে কাছ থেকে দেখা। সেতুর উপর থেকে নদীটিকে দেখা। চমৎকার এই দৃশ্য ও তখনকার সে অনুভূতি ব্যাখ্যা করার মতো নয়। গাড়ির জানালা থেকে সব ক’জোড়া চোখ চেয়ে ছিল সে সৌন্দর্যটুকু দেখে নিতে।

রাতের যমুনা সেতু; source: Bridges of Bangladesh

লম্বা ভ্রমণ, মাঝপথে বগুড়ার আগেই গাড়ি থামলো। সবাই নেমে হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলাম। খানিকক্ষণের বিশ্রাম শেষে গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। বগুড়া পেরিয়ে আমরা যখন রংপুরের পথে ঢুকলাম তখন প্রায় সকাল।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যখন গাড়ি থামলো তখন ঝকঝকে চারপাশ। একটা ছোট্ট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। সাথে ঘুরে নিলাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়; source: YouTube

এরপর আমাদের গন্তব্য ‘আরডিআরএস’ এনজিওর কুড়িগ্রামের অফিস (সেটিই ছিল আমাদের থাকার জায়গা)। রংপুর থেকে চলে এলাম কুড়িগ্রাম এবং স্থানীয়দের সহায়তায় আমরা খুঁজে বের করলাম অফিসটি। বিশ্রাম আর কিছু সময়ের ঘুম শেষে আমরা দুপুরের খাবার সেরে নিলাম আরডিআরএসের এনজিও অফিসেই। সাদা ভাত, কয়েক রকমের ভর্তা, সবজী, একদম আলাদাভাবে করা বেগুন ভাজা, মুরগীর মাংস ও ডালে দুপুরের খাওয়াদাওয়া ছিল অসাধারণ।

দুপুরের খাবার; source: Bhorer Kagoj

দুপুরের খাওয়া শেষে আমরা কুড়িগ্রাম শহরটির কিছু অংশ ঘুরে দেখলাম অটো ভাড়া নিয়ে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললাম এবং জেনে নিলাম বিভিন্ন সময় কেমন থাকে এ অঞ্চলের পরিবেশ। বিকেলটায় কুড়িগ্রাম শহরের যতটুকু অংশ ঘোরা যায় ঘুরে আমরা ফিরে এলাম সন্ধ্যা নামতেই। সন্ধ্যার পর ঘুমাতে যাওয়ার আগের বাকি সময়টুকু নানা আয়োজনে কাটালাম অফিসের ভেতরেই (কুড়িগ্রামের আরডিআরএস এনজিওর অফিসটিও অনেক সুন্দর)।

ঢাকা থেকে রংপুরের লম্বা ভ্রমণটিতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই প্রথম দিনটি কোনোভাবে আশেপাশের অংশ ঘুরে, অফিসেই কাটিয়েছি সবাই। পরদিন সকালে বেড়িয়ে পড়লাম কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী চরগুলোর দিকে।

নৌকা; source: We love Our Bangladesh

প্রথমে অটো ভাড়া করে চলে গেলাম নৌকা ঘাটের দিকে, যেখান থেকে নৌকা যোগে যাওয়া যায় চরগুলোতে। এখান থেকে দরদাম করে ভাড়া করে নিলাম ইঞ্জিন নৌকা। সারাদিনের জন্য নৌকা ভাড়া নিলো দেড় হাজার টাকা। ভাড়া ঠিক করে সবাই চেপে বসতেই ইঞ্জিন নৌকা চলতে শুরু করলো ধরলা নদীর বুকে।
প্রমত্ত ধরলাকে বলা হয় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ির দুঃখ।

৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ধরলা নদীটি ফুলবাড়ি উপজেলার ছয়টির মধ্যে চারটি ইউনিয়ন ‘নাওডাঙ্গা’, ‘শিমুলবাড়ি’, ‘ফুলবাড়ি’ ও ‘বড় ভিটা’র মধ্যে দিয়ে দুই শতাধিক চর সৃষ্টি করে কুড়িগ্রাম সদরের অদূরে যাত্রাপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে গিয়ে মিলেছে। ধরলা প্রতিবছর ফুলবাড়িবাসীকে বর্ষায় প্লাবিত করে কাঁদায় আর শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে তৃষ্টায় বুক ফাটিয়ে দেয়। তাই-ই মূলত ধরলাকে ফুলবাড়ির দুঃখ বলা হয়।

ধরলা নদী; source: Flickr

সেদিন ধরলার বুকে ভেসে বেড়ানো ছিল আমাদের সবার জন্য অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। সাথে কাছ থেকে দেখা হলো বন্যায় চরাঞ্চলের মানুষদের করুণ অবস্থা। চর, নদী আর চারপাশের সৌন্দর্য যেমন মুগ্ধ করছিল, তেমনি সাথে সাথে তৈরি করছিল হতাশাও।

এই ধরলা নদীর বুকে ইঞ্জিন নৌকায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতে চোখে পড়লো চর ঘেঁষে খানিক দূরেই ভারতের অংশ, মেঘ ছোঁয়া বিশাল সাদা পাহাড়গুলো। নদীতে ছোট ছোট নৌকায় চেপে মাঝিদের মাছ ধরার দৃশ্যও ছিল অনন্য। সাথে আলগার চর, সোহাগ চর, সুখের চরে পানি বন্দি মানুষগুলোর সাথে কাটানো আলাদা কিছু সময়। ইঞ্জিন নৌকার ছাদে শুয়ে বিশাল আকাশটি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল সময়টা এখানেই থেমে যাক, এভাবেই কেটে যাক বাকি জীবন।

চরাঞ্চল ও নদী; source: de.wikipedia.org

সারাদিন নৌকায় ঘুরে, সন্ধ্যা নামার আগে আমরা পৌঁছে গেলাম নৌকা ঘাটে। ভাড়া মিটিয়ে আবার অটোয় চেপে চলে গেলাম অফিসে। ব্যাগপত্র গুছিয়ে যত দ্রুত সম্ভব পথ ধরলাম রংপুরের।

দুপুরের খাবারটা সন্ধ্যায় সারলাম রংপুর শহরের ছোট্ট এক হোটেলে। খাওয়া শেষে চলে গেলাম রংপুর বাস স্ট্যান্ডে। হানিফের এসি বাসে ১১ জনের দলটা উঠে পড়লাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। অনেকগুলো ভালো স্মৃতি ও জীবনের ভিন্ন কিছু উপলব্ধি নিয়ে আমরা ফিরে এলাম চিরচেনা যান্ত্রিক কোলাহলের শহরে।

রংপুর টাউন হল; source: রংপুর জেলা

রংপুর শহর, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর টাউন হল, কুড়িগ্রাম শহর, মাঝপথে বগুড়ার দই ও খিরসা, প্রমত্ত ধরলা নদীর বুকে নৌকা ভ্রমণ ও সীমান্তবর্তী চরগুলো ঘুরে দেখতে আমাদের সময় লেগেছিল ৪ দিন। সাথে বাড়তি পাওয়া হিসেবে ছিল যমুনা সেতুর দারুণ সৌন্দর্য।
জীবনে ভিন্ন রকম কিছু অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে কবে যাচ্ছেন বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলাটিতে?

যেভাবে যাবেন

বাসে যেতে চাইলে

গাবতলি মাজার রোড থেকে ‘হানিফ’, ‘রোজিনা এন্টারপ্রাইজ’ ইত্যাদি বাসগুলো ছেড়ে যায় রংপুরের উদ্দেশ্যে। ভাড়া ৬৫০ থেকে ১৩৫০ টাকা পর্যন্ত (এসি, ননএসি)। সরাসরি বাস কাউন্টার থেকে কিংবা অনলাইনে সহজ-ডটকম থেকে টিকেট কাটতে পারেন পছন্দমতো।

ট্রেনে যেতে চাইলে

এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনেও যেতে পারেন রংপুর। বাসের তুলনায় ট্রেন ভ্রমণই আরামদায়ক হবে আর সময়ও বাঁচাবে। সেক্ষেত্রে কমলাপুর কিংবা উত্তরা থেকে রংপুর এক্সপ্রেসের টিকেট কাটতে হবে। টিকেট ফোনে বা অনলাইনেও কাটতে পারবেন। টিকেট মূল্য ৫০৫ টাকা থেকে ১৫১০ টাকা পর্যন্ত।
ফিচার ইমেজ- YouTube

Author

Write A Comment