ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের দূরত্ব প্রায় ৮৪ কিলোমিটার। বাসে মোটামুটি দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা হলেও জ্যামের কারণে সময়টা অনিশ্চিত। ইন্টারনেট ঘেঁটে পাওয়া তথ্যানুযায়ী যে পরিকল্পনা নিয়ে গিয়েছিলাম সবটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো জ্যামের কারণে। আড়াই ঘণ্টার রাস্তা, পৌঁছাতে সময় লেগেছে পুরো চার ঘণ্টা। বিষয়টা হতাশার।

টাঙ্গাইলের পথে, source: লেখিকা

গাজীপুর থেকে বেশ খানিকটা পথ (বড়জোর ২০ মিনিটের পথ) জ্যামের কারণে পার হতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। এখানেই পরিকল্পনা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনারা ভোরে রওনা দিতে পারেন, সময় বেঁচে যাবে এবং ভোরের দিকে জ্যামও খুব বেশি থাকে না। তাই যাত্রাটা বিরক্তিকরও হবে না।

আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল টাঙ্গাইল জেলা ঘুরে দেখা এবং সুযোগ করে শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দিকে যাওয়া। তাই টাঙ্গাইল নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা শেষে করে ফেললাম একটি পরিকল্পনা। সাহায্য নিলাম পরিচিতদের কাছ থেকে। আমার দলবল নিয়ে ৮টার বাসে রওনা দেয়ার কথা থাকলেও, রওনা দিতে হলো ১০টার পর। গাজীপুর থেকে জ্যামে পড়ে বিরক্ত হতে হয়েছে (বিশেষ করে চিত্রা এসে)।

টাঙ্গাইলের জলাবদ্ধ এলাকা; source: লেখিকা

জ্যাম পেরিয়ে শহুরে পরিবেশ বদলে গ্রামের স্নিগ্ধতা চোখে পড়লো খানিক বাদে। বাসের জানালায় চোখ রেখে বাইরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল সহজে। আমরা যখন টাঙ্গাইল এসে পৌঁছলাম তখন দুপুর ২টা। বাস থেকে নেমে একটা অটো ঠিক করে সবাই চলে গেলাম শহরের দিকে। টাঙ্গাইলের মোটামুটি বিখ্যাত হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট ‘সুগন্ধা’। অটো নিয়ে আমরা সুগন্ধার সামনে নামলাম।

খিচুড়ি, source: Bangla Tribune

পরিচ্ছন্ন হোটেল, সেখানে কর্মরত সকলের ব্যবহার ভীষণ ভালো। সুগন্ধায় দুপুরের খাবার সেরে নিতে আমরা অর্ডার করলাম সেখানকার বিশেষ হাড়ি খিচুড়ি। মাঝারি আকারের পিতলের হাড়িতে আসা এই খিচুড়ির ভেতরে থাকে খাসির মাংস, ডিম সেদ্ধ। চাইলে খাসির বদলে গরুর মাংস কিংবা মুরগীর মাংসও নিতে পারেন। টাঙ্গাইল যেমন চমচমের জন্য বিখ্যাত, তেমনি এই হাড়ি খিচুড়ির জন্যও বিখ্যাত হওয়া উচিত।

চমচম; source: BD Times365
দারুণ এই খিচুড়ি চেখে দেখতে একবারের জন্য হলেও যেতে পারেন টাঙ্গাইল, সুগন্ধা রেস্টুরেন্টে। খিচুড়ির পর্ব শেষে আমরা চমচমও চেখে নিয়েছিলাম। বিভিন্ন জেলার বিখ্যাত এই খাবারগুলো মিস না করাই উত্তম বলে মনে হয়। ভালো কিংবা মন্দ, জায়গাগুলো ভ্রমণের ক্ষেত্রে উভয় অভিজ্ঞতাই তুলে রাখা যেতে পারে। যা ভবিষ্যতে কিংবা অন্য কোনো ভ্রমণের ক্ষেত্রে কাজে আসে।
দুপুরের খাবার ও কিছুক্ষণের বিশ্রাম শেষে আমরা রওনা হলাম অন্য পথের দিকে। বাজার থেকে অটো ঠিক করে চলে গেলাম গ্রামের অনেকটা ভেতরে। সবুজ গাছে ঘেরা রাস্তার পাশ, মাঝখানের রাস্তা ধরে সাঁই সাঁই করে এগিয়ে চললো অটো। শহর ছেড়ে অনেকটা ভেতরে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য টাঙ্গাইলের ধোপাকান্দী গ্রাম। শহর থেকে অনেকটা ভেতরে, প্রত্যন্ত এই অঞ্চলটি।
ধোপাকান্দির পথে; source: BD Times365

গ্রামে পৌঁছাতে হলে সরাসরি সড়ক পথে যাওয়ার উপায় নেই। শহর থেকে দেড় ঘণ্টা সড়ক পথে অটোতে এগিয়ে আমরা নৌকা ঘাট পৌঁছলাম। অসংখ্য নৌকার দেখা পাওয়া যায় এখানকার ঘাটে। এই নৌকাগুলোই মূলত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামগুলোতে পারাপারে ব্যবহৃত হয়। যমুনার ভাঙ্গনে প্রায়ই রূপ বদলায় এখানকার গ্রামগুলোর।

নৌকাঘাট; source: লেখিকা

বিশাল ইঞ্জিন নৌকায় সবাই চেপে বসলাম গ্রামের উদ্দেশ্যে। পানিতে ঘেরা চারপাশ। স্থানীয় এক লোকের মাধ্যমে জানলাম, গ্রীষ্মের সময় এখানকার পানি শুকিয়ে যায়। লোকজন পায়ে হেঁটে চলাচল করে। তখন এখানকার অধিকাংশ অংশে ধান সহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। কথাগুলো শুনে ভীষণ অবাক লাগছিল আমাদের। এই জলাবদ্ধ জায়গায় বসে, গ্রীষ্মের বর্ণনা শুনে কল্পনাও করতে পারছিলাম না সেই দৃশ্য। নৌকার এই যাত্রাটি ছিল সারাদিনের সেরা সময়।

টাঙ্গাইলে নৌকা ভ্রমণ; source: লেখিকা

আমরা যখন ধোপাকান্দি পৌঁছলাম তখন বিকেল অনেকটা হেলে পড়েছে। নৌকা থেকে নেমে আঁখের ক্ষেতের সরু পথ ধরে আমরা এগিয়ে গেলাম ভেতরে। এই গ্রামটির অনেক অংশ (একটি প্রাইমারি স্কুল সহ) যমুনার ভাঙ্গনে হারিয়ে গেছে তখন। গ্রামটি দেখে অবাক লাগছিল খুব। বর্তমান সময়েও গ্রামটি অনেক আধুনিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, শুধু এই একটিমাত্র গ্রাম নয় এখানকার বেশ কিছু গ্রামই পড়ে আছে পুরনো দিনের মতো মোমের আলো আর পুরনো ভাবনা নিয়ে। যেমন পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ, তেমনি আধুনিক চিন্তা।

টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত গ্রামে; source: লেখিকা

জায়গাগুলো ঘুরে দেখে আমরা শহরের পথ ধরলাম যখন, তখন সন্ধ্যা। অন্ধকার নেমে গেছে গ্রাম জুড়ে। নৌকায় চড়ে বসতে হারিকেনের আলো নিয়ে এগিয়ে চললো নৌকা। মাঝি কিছুদূর যেতেই বিভিন্ন জায়গার নাম বলে চিৎকার করে উঠছিলেন, অন্ধকারে বেশ কিছু কণ্ঠ সায় দিয়ে জানাচ্ছিলেন ঠিক পথেই আগাচ্ছে নৌকা। এই অভিজ্ঞতা ছিলো ভ্রমণ জীবনের একদমই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।

নৌকাঘাটে পৌঁছে ঠিক একইভাবে অটোয় চেপে ফিরতে হয়েছে বাস স্ট্যান্ড। টাঙ্গাইল বাস স্ট্যান্ড থেকে ঢাকাগামী শেষ বাসটি ছেড়ে যায় রাত সাড়ে ৯টায়। সাড়ে ৯টার বাসে রওনা হয়ে আমরা ঢাকায় পৌঁছেছিলাম রাত ১টায়।

গ্রামের নৌকা; source: লেখিকা

শুধু নির্দিষ্ট কিছু দর্শনীয় স্থান নয়, যদি আপনি প্রকৃতপক্ষেই ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন এবং পুরো বাংলাদেশ ঘিরেই আপনার আগ্রহ থাকে তবে আপনার জন্য এই ভ্রমণটি দারুণ কিছু অভিজ্ঞতা রাখছে, যা আপনার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের সর্বত্র পা ফেলে সকল দেশের সেরা এই দেশের সৌন্দর্য অবলোকন করতে চাইলে ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়তে পারেন। শুরুটা নাহয় এখান থেকেই হলো।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘নিরালা’, ‘বিনিময়’, ‘ঝটিকা’, ‘ধলেশ্বরী’ ইত্যাদি বাস টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। টাঙ্গাইল পৌঁছে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে, অটো কিংবা সিএনজি ভাড়া করে ঘুরতে পারেন নিজের ইচ্ছে মতো।

টাঙ্গাইল ভ্রমণ

টাঙ্গাইলে বেশ কিছু জমিদার বাড়ি রয়েছে যা ভ্রমণকালে ঘুরে দেখে আসতে পারেন। তার মধ্যে ‘করটিয়া জমিদার বাড়ি’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আরো রয়েছে ঐতিহ্যবাহী আতিয়া মসজিদ, দেলদুয়ার জমিদার বাড়ী, মওলানা ভাসানীর সমাধি ও জাদুঘর এবং মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। টাঙ্গাইলের চমচম এবং সুগন্ধার হাড়ি খিচুড়ির স্বাদ নিতেও ভুলবেন না।
ফিচার ইমেজ- Pinterest

Author

Write A Comment