বাড়ি চাঁদপুর হবার সুবাদে প্রায়শই নর্থব্রুক রোড ধরে সদরঘাট যাওয়া হয়। যাওয়ার পথে একটা লাল বাড়ি চোখে পড়তো সবসময়ই। মনে প্রশ্নও জেগেছিল, এটা কার বাড়ি? কিন্তু কৌতূহল মেটানোর জন্য ভিতরে ঢুকে দেখা হয়নি।
তারপর এই সেদিন ঐতিহ্যবাহী লালকুঠি দেখার জন্য রিকশায় চেপে বসেছিলাম। রিকশাওয়ালা যখন সেই পরিচিত লালবাড়িটার সামনে নামিয়ে দিয়েছিল, তখন নিজের বোকামি দেখে হেসে ফেলেছি। ফরাশগঞ্জে অবস্থিত লালকুঠি ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও সৌন্দর্যময় স্থাপত্য নিদর্শন। দালানটি লাল রঙের হওয়ায় এটি লালকুঠি নামে পরিচিত। এর পূর্বনাম নর্থব্রুক হল১৮৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে তার সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এ ভবনটি টাউন হল হিসেবে নির্মাণ করা হয়। নর্থব্রুকের সম্মানে এ ভবনের নামকরণ করা হয় নর্থব্রুক হল। হয়তো ওই একই কারণে রাস্তাটার নাম নর্থব্রুক রোডপিছনের দিক থেকে লালকুঠি।    সোর্সঃ রিসাত
রিকশা থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম স্থাপনাটি দেখার জন্য। গেট দিয়ে ঢুকতেই স্থাপত্যটির সাথে সাথে চোখে পড়বে সামনেই একটি তারকাকৃতির বসার জায়গা। ওটার সামনেই সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে দেড়শ বছরের পুরোনো লালকুঠি।
পুরাতন বাড়ি মানেই আভিজাত্য। এত সুন্দর কারুকাজ পিলারগুলোর মধ্যে! ঘুরে ঘুরে দেখছি, আর ভিতরের কিছু লোক আমাদের দেখছে। এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন মাত্র চিড়িয়াখানা থেকে ছাড়া পেয়েছি, অথচ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এই লালকুঠি ছিল এক সময় পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু। লোকে লোকারণ্য হয়ে থাকতো লালকুঠির ভিতর-বাহির।
৩৬৫টি আসনের হলরুমে নাটক ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহার করা হতো বাড়িটি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক মিটিং উপলক্ষেও এ হল ব্যবহার করত। সেই সময়ে এ নর্থব্রুক হলে প্রায় নিয়মিতই মঞ্চ নাটক অনুষ্ঠিত হতো। ষাটের দশকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখানে নাটক চলত। বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রবীর মিত্র ষাটের দশকে লালকুঠিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা করতেন। এ লালকুঠির নাটক থেকেই তিনি সিনেমায় এসেছিলেন। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘তখন বিনোদনের তেমন কোনো জায়গা ছিল না। মানুষ এখানে আসত, প্রচণ্ড ভিড় হতো।’
কারুকার্যময়তা।     সোর্সঃ রিসাত

লালকুঠির মূল ভবনের ডান দিকে বড় একটি মঞ্চে নাটক হতো। এখন মঞ্চটি অবহেলায় পড়ে আছে। মঞ্চের উপরে বহু পুরোনো একটা শামিয়ানা টাঙানো আছে। কিছু ভ্যানগাড়ি রাখা আছে দেখলাম।
এই লালকুঠির আরো একটা পরিচয় আছে। ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা পৌরসভা সংবর্ধনা দেয়। একজন বড় মাপের কবি আসবেন ঢাকায়, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন তা নিয়ে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ভাবনার অন্ত নেই। কবির থাকার ব্যবস্থা কোথায় হবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী নবাবদের তুরাগ বোট হাউস? কবি তুরাগ বোটকেই বেছে নেন। বুড়িগঙ্গা নদী-তীরবর্তী এই লালকুঠিতেই তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

মিনার; সোর্সঃ রিসাত

খুব কাছেই সদরঘাট। মূল ঘাট থেকে চাঁদপুরের ঘাট আলাদা করে ঠিক লালকুঠির সামনের জায়গাটিতেই স্থাপন করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর পরই ওখান থেকে ভেসে আসছে লঞ্চের সাইরেন। চারদিকে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে লাল রঙের দালানটি প্রায় ঢাকাই পড়ে যেত। যেটুকু দেখা যায়, লাল রংটির কারণেই দেখা যায়।

কুঠির পেছনটায় আছে শতবর্ষী একটি পাঠাগার, যা জনসন হল নামে পরিচিত। লালকুঠি বাম পাশের বাড়িটির সামনে “বিপদজনক” সাইনবোর্ড টাঙানো। ওটা কী কাজে ব্যবহৃত হতো, জানতে পারিনি।

এই দালানটিতে প্রবেশ নিষেধ! সোর্সঃ রিসাত

লালকুঠির সেই জৌলুশ হারিয়ে গিয়েছে। ভবনটির বিভিন্ন স্থানের দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। প্রধান ফটকের আস্তর খসে পড়ে ইট বেরিয়ে গেছে। চারপাশের বিভিন্ন দরজা-জানালা ভাঙাচোরা, ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা। কোথাও আবার পাখি বাসা বেঁধেছে।

ভবনের ভেতরের ঢুকতে পারিনি, তালা দেওয়া ছিল। শুনেছি, অবস্থা আরও করুণ। ঢুকতেই মাকড়সার জালে জড়িয়ে যায় মাথা। ধুলাবালিতে জরাজীর্ণ হয়ে আছে চারপাশ। নাট্যমঞ্চটির অবস্থা খুবই শোচনীয়। মঞ্চটি এবড়োখেবড়ো। পাটাতনের নেই কোনো সামঞ্জস্যতা। কোথাও কোথাও কাঠ ভেঙে ফাঁকা পড়ে আছে। মঞ্চের পেছনের কিছু অংশ ভাঙা। মঞ্চের পর্দা নেই কতদিন ধরে, তা কেউ জানে না। ছাদের কিছু অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়তে পড়তে কয়েক স্থানে সিলিং ধসে পড়েছে।

সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো সিলিংয়ের কাঠগুলো খসে পড়ছে। মঞ্চের বাম দিকেই কার্পেটগুলো বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। পাশের বিভিন্ন স্থানের কার্পেটগুলোর অবস্থা একই ধরনের। ভেতরের বাতিগুলোও নষ্ট। ব্যবহার না থাকায় নষ্ট হয়ে অচল হয়ে আছে বেশিরভাগ ফ্যান। নেই কোনো সাউন্ড সিস্টেম। দুটি পোশাক পরিবর্তনের কক্ষের একটিও ভালো নেই। দুটি ফ্যানের একটি নষ্ট। অপরটিও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সিলিংয়ের বিভিন্ন অংশ খসে পড়েছে। হলরুমে ৬টি এসির সবকটিই নষ্ট।

স্তম্ভ; সোর্সঃ রিসাত

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে লালকুঠি। দীর্ঘদিন ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় নষ্ট হচ্ছে এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম। এখন লালকুঠিতে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মঞ্চের ব্যবস্থাপনাও ভালো নয়। দুই বছর ধরে হলের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এখনই সংস্কার করা না হলে এর ভেতরে যে সরঞ্জাম অবশিষ্ট আছে, তা-ও নষ্ট হয়ে যাবে। সংস্কারের অভাবে দুই বছর ধরে এর কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে সরকারের উপার্জনের একটি স্থান নষ্ট হয়ে গেছে।

একটা ব্যাপার খুবই অবাক লাগে। অন্যান্য দেশ তাদের নিজস্ব হেরিটেজগুলোকে সর্বোচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ করে। অথচ এসব দিকে আমাদের অবহেলা চোখে পড়ার মতো। স্থানীয়দের নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকে লালকুঠি গড়ে উঠেছিল। এমন একটা স্থাপনা পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে, দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। প্রশাসন কি পারে না মূল দালানটি সংস্কার করে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে? লালকুঠি তার জৌলুশ ফিরে পেলে এটি অনায়াসেই পুরান ঢাকার একটি সংস্কৃতি কেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।

জানালাগুলোর বেহাল দশা।     সোর্সঃ রিসাত

কীভাবে যাবেন:

সদরঘাটগামী বাসে ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে নেমে নর্থব্রুক রোড ধরে হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিট লাগবে। নর্থব্রুক রোড চিনতে না পারলে, আশেপাশের যে কাউকে চাঁদপুরের ঘাটে যাওয়ার রাস্তা বললেই দেখিয়ে দেবে। তারপরেও রাস্তা চিনতে না পারলে রিকশাওয়ালাকে “লালকুঠি” বললেই দিয়ে আসবে। ভাড়া নেবে দশ টাকা।
ফিচার ইমেজ- wikimedia.org

Author

Write A Comment